প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে দেবী দুর্গার বিদায়


বাংলার মুখ প্রতিবেদক প্রকাশের সময় : অক্টোবর ২১, ২০২৬, ৮:৪২ অপরাহ্ন

টানা পাঁচ দিনের পূজা-অর্চনা, আনন্দ-উৎসব ও নানা ধর্মীয় আচার শেষে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে বিদায় নিয়েছেন দেবী দুর্গা। বুধবার (২১ অক্টোবর) বিকেলে রাজধানীর ওয়াইজঘাটে বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে হাজারো ভক্তের উপস্থিতিতে প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয়। এর মধ্য দিয়ে সমাপ্তি ঘটে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গোৎসবের।

দুপুর থেকেই রাজধানীর বিভিন্ন মন্দির ও মহল্লা থেকে ঢাক-ঢোল, কাঁসর-ঘণ্টার বাদ্যে শোভাযাত্রা নিয়ে প্রতিমাগুলো ওয়াইজঘাটে আনা হয়। পরে নৌকাযোগে নদীর মাঝখানে নিয়ে প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয়। উৎসবের শেষ মুহূর্তে আনন্দের আবহ ছাপিয়ে ভক্তদের মধ্যে নেমে আসে বিদায়ের বিষাদ।

কারও চোখে অশ্রু, কারও কণ্ঠে দেবীর বন্দনা। কেউ শেষবারের মতো মায়ের কাছে প্রার্থনা করেছেন নিজের ও পরিবারের মঙ্গল কামনায়, আবার কেউ নদীর পানি ছিটিয়ে নিয়েছেন নিজের শরীরে ও স্বজনদের গায়ে।

‘মা চলে যাচ্ছেন, খুব কষ্ট লাগছে’

মহাখালী থেকে বাবার সঙ্গে ওয়াইজঘাটে প্রতিমা বিসর্জন দেখতে আসা নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী প্রিয়স্মিতা বলে, দশমীর লগ্ন শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তার মন খারাপ হতে শুরু করে।

সে বলে, “খুব কষ্ট লাগছে, মা চলে যাচ্ছেন। এই কয়েক দিন মা ছিলেন, তাই আনন্দে কেটেছে। মায়ের কাছে চাওয়া, মা যেন এ দেশ থেকে সব ধরনের অপশক্তি দূর করে দেশকে শান্তিময় করেন। সবাইকে ভালো রাখেন।”

পুরান ঢাকার হাজারীবাগ গণকটুলী থেকে আসা রীমা রানীও জানালেন, পূজার দিনগুলো আনন্দে কেটেছে। দেবী দুর্গার বিদায়ে সেই আনন্দের জায়গায় এসেছে শূন্যতা।

তিনি বলেন, মা দুর্গা তাঁদের মাঝে ছিলেন বলে চারপাশ আনন্দে ভরে উঠেছিল। এখন আবার এক বছর অপেক্ষা করতে হবে। এবারের পূজায় তাঁর প্রার্থনা ছিল, দেশ যেন শান্তিময় হয় এবং সবার জীবনে সুখ ও সমৃদ্ধি আসে।

অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের প্রার্থনা

ধানমন্ডি থানা পূজা উদযাপন কমিটির যুগ্ম সম্পাদক শ্রী রাজিব কুন্ডু বাংলানিউজকে বলেন, ভারাক্রান্ত হৃদয়ে তাঁরা দেবীকে বিদায় জানাতে এসেছেন। অশুভ শক্তির বিনাশ ও মানুষের মঙ্গলের জন্য দেবী দুর্গার কাছে প্রার্থনা করেছেন তাঁরা।

তিনি বলেন, “আমরা মায়ের কাছে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ চাই, যাতে অশুভ শক্তি মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না পারে। অন্যায়-অপরাধ দূর হোক। আগামীতে দেশ যেন সুন্দর ও সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত হয় এবং সব মানুষের মঙ্গল হয়, এটাই মায়ের কাছে প্রার্থনা।”

দশমীতে সিঁদুর খেলা

দুর্গাপূজার শেষ দিন বিজয়া দশমীর সকালে বিভিন্ন মণ্ডপ ও মন্দিরে অনুষ্ঠিত হয় বিশেষ ধর্মীয় আচার। নারীরা দেবী দুর্গার পায়ে সিঁদুর নিবেদন করে তাঁর শক্তির প্রতি শ্রদ্ধা জানান। পরে একে অপরকে সিঁদুর পরিয়ে দেন এবং জীবনে সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধি কামনা করেন।

দিনভর ধর্মীয় আচার, সিঁদুর খেলা ও প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে শেষ হয় এবারের শারদীয় দুর্গোৎসব। বিদায়ের বেদনার মধ্যেও আগামী বছর আবার দেবীর আগমনের প্রত্যাশায় ঘরে ফেরেন ভক্তরা।

বিসর্জন ঘিরে কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা

প্রতিমা বিসর্জন নির্বিঘ্ন করতে রাজধানীর ওয়াইজঘাট ও আশপাশের এলাকায় নেওয়া হয় কয়েক স্তরের নিরাপত্তাব্যবস্থা। শোভাযাত্রা ও বিসর্জন কার্যক্রম ঘিরে পুলিশ, গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি), পুলিশের বিশেষায়িত দল সোয়াট, আনসার গার্ড ব্যাটালিয়ন এবং ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দলসহ বিভিন্ন সংস্থার সদস্যরা দায়িত্ব পালন করেন।

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) যুগ্ম কমিশনার (ক্রাইম) ফারুক হোসেন জানান, ওয়াইজঘাটসহ সংশ্লিষ্ট এলাকায় পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে। পোশাকধারী ও সাদাপোশাকের পুলিশের পাশাপাশি বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন। পুলিশের সঙ্গে নৌ পুলিশ, কোস্টগার্ড ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও কাজ করছে।

তিনি আরও জানান, গতবার প্রতিমা বিসর্জনের জন্য একটি স্থান নির্ধারণ করা হলেও এবার তিনটি স্থান নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রতিমাবাহী ট্রাকের চলাচল নির্বিঘ্ন করতে সড়ক একমুখী করা হয়েছে। এতে নির্ধারিত পথে ট্রাকগুলো প্রবেশ করতে এবং বিসর্জন শেষে সহজে বের হয়ে যেতে পারবে। পাশাপাশি যানজট এড়াতে নেওয়া হয়েছে বিশেষ ট্রাফিক ব্যবস্থাও।

দেবী দুর্গার বিদায়ের মধ্য দিয়ে শেষ হলো পাঁচ দিনের উৎসব। তবে ভক্তদের প্রার্থনায় রয়ে গেল শান্তি, সম্প্রীতি ও কল্যাণের প্রত্যাশা—আগামী বছর আবারও দেবীর আগমনের অপেক্ষা।