ভুয়া পরিচয় ও নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানের নামে আইএফআইসি ব্যাংক থেকে ১৩ হাজার ১৬৬ কোটি টাকার ঋণ নেওয়ার তথ্য উঠে এসেছে বিশেষ নিরীক্ষায়। গত ১৫ বছরে ২৮টি প্রতিষ্ঠানের নামে বিতরণ করা এসব ঋণের পুরো অর্থই বর্তমানে খেলাপি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ঋণগুলোর বিপরীতে এখন পর্যন্ত কোনো অর্থ আদায় হয়নি বলেও দাবি করা হয়েছে।
নিরীক্ষা-সংক্রান্ত তথ্য অনুযায়ী, প্রকৃত ঋণগ্রহীতার পরিচয় আড়াল করতে আত্মীয়স্বজন, কর্মচারী, সহযোগী প্রতিষ্ঠান ও নামসর্বস্ব কোম্পানির নামে ঋণ দেওয়া হয়েছে। এসব ঋণের পরিমাণ ব্যাংকটির মোট খেলাপি ঋণের প্রায় অর্ধেক। ঋণ বিতরণে অনিয়মের সঙ্গে আইএফআইসি ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান ও তৎকালীন সরকারের প্রভাবশালী ব্যক্তি সালমান এফ রহমানের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও উঠে এসেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য এবং তদন্তের চূড়ান্ত ফলাফল আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বিতর্কিত ব্যবসায়ী নজরুল ইসলাম মজুমদারের মালিকানাধীন নাসা গ্রুপের নামে আইএফআইসি ব্যাংক থেকে ১ হাজার ৩৩৩ কোটি টাকা এবং জয়নুল হক সিকদারের সিকদার গ্রুপের নামে ১ হাজার ৫৭ কোটি টাকা ঋণ নেওয়া হয়েছে।
নতুন বোর্ডের পরও আর্থিক সংকট
ব্যাংকটির পরিচালনা ও ঋণ বিতরণে অনিয়ম নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পর ২০২৪ সালের ৪ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংক তৎকালীন পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে নতুন পর্ষদ গঠন করে। পরবর্তী সময়ে ব্যাংকটির সুশাসন, আর্থিক সূচক এবং অনিয়ম নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা নিয়ে আবারও উদ্বেগ দেখা দেয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংক পর্যবেক্ষক নিয়োগ করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি, মূলধন ঘাটতি এবং বড় অঙ্কের লোকসানের কারণে আর্থিক চাপে রয়েছে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত আইএফআইসি ব্যাংক। রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর আগে নিয়মিত হিসেবে দেখানো বা যথাযথভাবে শ্রেণিবিন্যাস না করা ঋণ নতুন করে খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত হওয়ায় ব্যাংকটির আর্থিক দুর্বলতা আরও স্পষ্ট হয়েছে।
মূলধন ঘাটতি ও লোকসানের চাপ
আর্থিক বিবরণী অনুযায়ী, ২০২৫ অর্থবছর শেষে ব্যাংকটির প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রক মূলধন ছিল ৫ হাজার ৮৬৩ কোটি ২০ লাখ টাকা। প্রতিবেদনে মূলধন ঘাটতি প্রায় ৪ হাজার ৭৯৯ কোটি টাকা বলে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সময়ে মূলধন পর্যাপ্ততার হার বা সিআরএআর ২০২৪ সালের ৭ দশমিক ২৭ শতাংশ থেকে কমে ২০২৫ সালে ১ দশমিক ৮২ শতাংশে নেমে আসে। এই হার বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্ধারিত ১০ শতাংশের চেয়ে অনেক কম।
ব্যাংকটির মুনাফার অবস্থাও উল্লেখযোগ্যভাবে খারাপ হয়েছে। ২০২৫ অর্থবছরে সুদ আয় হয়েছে ২ হাজার ২১০ কোটি ২১ লাখ টাকা, যা আগের বছর ছিল ৪ হাজার ১৪ কোটি ৫৩ লাখ টাকা। বিপরীতে আমানত ও ঋণের বিপরীতে সুদ বাবদ ব্যয় হয়েছে ৪ হাজার ৪১৯ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। ফলে সুদ আয় ও ব্যয়ের ব্যবধান থেকে নিট সুদ ক্ষতি দাঁড়ায় প্রায় ২ হাজার ২০৯ কোটি ৫০ লাখ টাকা।
এ ছাড়া ২০২৫ সালে ব্যাংকটির পরিচালন লোকসান হয়েছে ২ হাজার ৩৬৫ কোটি ৫০ লাখ টাকা। শেয়ারপ্রতি লোকসান আগের বছরের ৫৩ পয়সা থেকে বেড়ে ১৩ টাকা ৩৩ পয়সায় দাঁড়িয়েছে। বছর শেষে কর-পরবর্তী নিট লোকসান ছিল ২ হাজার ৫৬১ কোটি ৭০ লাখ টাকা।
সঞ্চিতি ঘাটতিও উদ্বেগজনক
নিরীক্ষা তথ্যে ঋণের বিপরীতে প্রয়োজনীয় সঞ্চিতি বা প্রভিশন সংরক্ষণে ঘাটতির বিষয়টিও উঠে এসেছে। ব্যাংকটির সাধারণ সঞ্চিতির প্রয়োজন ছিল ২ হাজার ৭০১ কোটি ৬২ লাখ টাকা। এর বিপরীতে সংরক্ষিত অর্থ ছিল ২ হাজার ৫ কোটি ৭১ লাখ টাকা, ফলে ঘাটতি দাঁড়ায় ৬৯৫ কোটি ৯১ লাখ টাকা।
এ ছাড়া অন্য ব্যাংকে রাখা মেয়াদি আমানত এবং অফ-ব্যালান্স শিট দায়ের বিপরীতেও সঞ্চিতি ঘাটতির তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ৩০ এপ্রিল বাংলাদেশ ব্যাংক বিশেষ নির্দেশনার মাধ্যমে এবি ব্যাংকে রাখা অর্থসহ নির্দিষ্ট কিছু ঋণ ও আমানতের বিপরীতে প্রায় ২ হাজার ১৫৮ কোটি টাকার সঞ্চিতি তাৎক্ষণিকভাবে সমন্বয় না করেই ২০২৫ অর্থবছরের আর্থিক বিবরণী চূড়ান্ত করার অনুমতি দেয়।
যেসব প্রতিষ্ঠানের নামে বড় অঙ্কের ঋণ
আইএফআইসি ব্যাংকের নথিতে নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানের নামে নেওয়া বড় অঙ্কের ঋণের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে শ্রীপুর টাউনশিপ। প্রতিষ্ঠানটির ঋণস্থিতি ১ হাজার ২৫ কোটি ৯২ লাখ টাকা বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও যেসব প্রতিষ্ঠানের ঋণের পরিমাণ উল্লেখ করা হয়েছে, সেগুলো হলো—
আসাদ ট্রেডিং অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং: ৭৩৩ কোটি ৩২ লাখ টাকা
গ্লোয়িং কনস্ট্রাকশন অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং: ৭২৩ কোটি ৭৯ লাখ টাকা
কুইক রিয়েল এস্টেট: ৬৮৫ কোটি ৪২ লাখ টাকা
সানস্টার বিজনেস: ৬৭৪ কোটি ৫৫ লাখ টাকা
ফারইস্ট বিজনেস: ৬৭৪ কোটি ৪৯ লাখ টাকা
কসমস কমোডিটিজ: ৬৭২ কোটি ২০ লাখ টাকা
ব্লুমুন ট্রেডিং: ৬৬৬ কোটি ৩৯ লাখ টাকা
আলফা এন্টারপ্রাইজ: ৬৫৫ কোটি ১৪ লাখ টাকা
অ্যাক্সিস বিজনেস: ৬৪৪ কোটি ২৪ লাখ টাকা
এভারেস্ট এন্টারপ্রাইজ: ৬০৫ কোটি ২৮ লাখ টাকা
স্কাইমার্ক ইন্টারন্যাশনাল: ৬০৪ কোটি ৭০ লাখ টাকা
ভিস্তা ইন্টারন্যাশনাল: ৫২১ কোটি ৩ লাখ টাকা
অ্যাবসোলিউট কনস্ট্রাকশন অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং: ৫০৬ কোটি ৪১ লাখ টাকা
এ ছাড়া সার্ভ কনস্ট্রাকশন, অলট্রন ট্রেডিং, নর্থস্টোন কনস্ট্রাকশন, টিমবিল্ড কনস্ট্রাকশন, সেন্ট্রাল ল্যান্ড অ্যান্ড বিল্ডিংস, সৃষ্টি রিয়েল এস্টেট, ক্রিস্টাল কনস্ট্রাকশন, গ্লোবাল এলপিজি, এলহাম ফ্যাশন, রাজ হাউজিং, ব্রাইটস্টার বিজনেস, সেন্ট্রাল হাইটস ঢাকা, নিউ ঢাকা ইন্ডাস্ট্রিজ ও এলহাম ইন্টারন্যাশনালের নামও প্রতিবেদনে এসেছে। এসব প্রতিষ্ঠানের নামে বড় অঙ্কের ঋণ বকেয়া থাকার তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশেষ নিরীক্ষায় উঠে আসা তথ্য এবং ব্যাংকটির আর্থিক বিবরণী মিলিয়ে ঋণ আদায়, সুশাসন নিশ্চিত করা ও মূলধন ঘাটতি মোকাবিলা এখন আইএফআইসি ব্যাংকের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আপনার মতামত লিখুন :