সন্ধ্যাটা যেন হঠাৎ করেই থমকে গিয়েছিল। প্রতিটি দীর্ঘশ্বাসে জড়িয়ে ছিল এক অপার্থিব বেদনা ও শূন্যতা। সংগীতাঙ্গনের অত্যন্ত প্রিয় ও নিবেদিতপ্রাণ মানুষ, গুণী গিটারিস্ট রাসেল খানের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনায় আয়োজিত দোয়া মাহফিলে উপস্থিত সবার বুকটাই ভারী হয়ে আসছিল। দেশের সংগীত জগতের বহু পুরোনো চেনা মুখগুলোর একত্র হওয়া এই সন্ধ্যাটি রূপ নিয়েছিল অশ্রুসিক্ত এক স্মৃতি তর্পণে।
সবার চোখেমুখেই ছিল একটাই অব্যক্ত প্রশ্ন—রাসেল সত্যি এভাবে আমাদের সবাইকে ছেড়ে চলে গেল?
সোনালী দিনের স্মৃতি ও নিখাদ ভালোবাসার মানুষ:
স্মরণসভায় উপস্থিত সকলে রাসেলের সাথে কাটানো সোনালী দিনগুলোর কথা স্মরণ করেন। সহকর্মী ও বন্ধুবান্ধবরা তুলে ধরেন রাসেলের অমায়িক ব্যবহার, মিউজিকের প্রতি তাঁর নিখাদ ভালোবাসা এবং স্টুডিও থেকে স্টেজে তাঁর কাজের স্মৃতিচারণ।

খ্যাতিমান সঙ্গীত পরিচালক ও মাইলস ব্যান্ডের অন্যতম সদস্য মানাম আহমেদ বলেন, ‘ রাসেল ছিল বিশুদ্ধ হৃদয়ের অধিকারী একজন মানুষ। তার সাথে আমার কাজ করা হয়নি। কিন্তু তার আয়োজনে স্টেজে বাজিয়েছি। খুবই যত্নবান একজন আমাদের ছেড়ে চলে গেলো।’
অনুষ্ঠানে আবেগাপ্লুত কণ্ঠে গীতিকার কবির বকুল স্মৃতিচারণ করে বলেন, ‘রাসেল ছিল আমাদের টিমের সবচেয়ে ছোট এবং আদরের সদস্য। ওর উপস্থিতি মানেই ছিল হাসিখুশি পরিবেশ। ছোট বলে আমরা যেমন তাকে স্নেহে আগলে রাখতাম, সে-ও তেমনি তার প্রাণবন্ত স্বভাব দিয়ে সবাইকে মাতিয়ে রাখত।’
সংগীত জগতের প্রবীণ মিউজিশিয়ান এনাম রাসেলের পেশাদারিত্বের প্রশংসা করে বলেন, ‘সংগীতাঙ্গনে দুই ধরনের শিল্পী দেখা যায়—একদল অত্যন্ত অ্যাক্টিভ আর অন্যদল তাদের ওপর নির্ভরশীল। রাসেল ছিল প্রথম দলের। সব কাজে সে থাকত শতভাগ অ্যাক্টিভ। যেকোনো পরিস্থিতিতে বা প্রয়োজনে কাউকে ‘না’ বলা রাসেলের স্বভাবের মধ্যে ছিল না। তার মুখের সেই চেনা অমলিন হাসিটাই বলে দিত সে কতটা সচ্ছল ও সৎ হৃদয়ের মানুষ।’ অবসকিউর ব্যান্ডের সাঈদ হাসান টিপু বলেন, ‘তরুণ এবং প্রবীণ সব মিউজিশিয়ানদেরই নিজেদের প্রতি যত্নবান হতে হবে। একে একে স্মৃতিচারণ করেন, ফিডব্যাক ব্যান্ডের ফুয়াদ নাসের বাবু, পার্থ বড়ুয়া, সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ার শামীম প্রমুখ। অনুষ্ঠানে রাসেল খানের ছেলে উষ্ণ বাবার স্মৃতি তুলে ধরে বলেন, ‘ তার বাবা সত্যিই একজন সেলিব্রিটি। যা তার বাবা আগেই তাকে বলে গিয়েছিলো। এতদিন বুঝতে না পারলেই এই অনুষ্ঠানে ছেলে ঠিকই তা অনুভব করতে পেরেছে। রাসেল খানের স্ত্রী এবং একমাত্র মেয়ে বর্তমানে দেশের বাইরে রয়েছেন। রাসেল খানের বড়ভাই অনুষ্ঠানে বলেন, ‘রাসেল আমাদের অনেক স্নেহের ভাই ছিলো। আমাদের পরিবারের চেয়েও আপনাদের পরিবারের সদস্য হিসেবে রাসেল বেঁচে থাকবে চিরদিন। ‘
এছাড়াও সহকর্মী পারকেশন যন্ত্রী উজ্জ্বলসহ আরও অনেকেই স্টুডিও ও স্টেজ পারফরম্যান্সের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেন। চারপাশ আলোকিত রাখা রাসেলের সেই প্রাণবন্ত উপস্থিতি এখন শুধুই স্মৃতি।
স্বজনদের অশ্রু আর স্মৃতির ক্যানভাস:
অনুষ্ঠানে রাসেলের পরিবারের সদস্যরাও উপস্থিত হয়ে এক হৃদয়বিদারক পরিবেশের সৃষ্টি করেন। রাসেলের ভাই, বোন ও সন্তানরা যখন রাসেলের সঙ্গে কাটানো জীবনের বিভিন্ন আবেগঘন মুহূর্ত শেয়ার করছিলেন, তখন উপস্থিত অনেকেই চোখের জল ধরে রাখতে পারেননি।
বিদায় রাসেল, ওপারে শান্তিতে থেকো:
পার্থ বড়ুয়াসহ সংগীতাঙ্গনের ঘনিষ্ঠ সহকর্মী সাব্বির, উজ্জ্বল, টন্টি, কিশোর ও এনায়তের সার্বিক সহযোগিতায় স্মরণসভা ও দোয়া মাহফিলটি সম্পন্ন হয়েছে।
অনুষ্ঠানের শুরতে রাসেলের আত্মার মাগফিরাত কামনায় বিশেষ মোনাজাত করা হয়। দেশের সংগীতাঙ্গণের শিল্পী, মিউজিশিয়ান, বন্ধুবান্ধব এবং পরিবারের সদস্যরা এই আয়োজনে উপস্থিত থেকে তাঁকে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করেছেন।
আপনার মতামত লিখুন :