শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নিরাপত্তা স্ক্যানার পার হয়ে ব্যাগে ৩১ রাউন্ড তাজা গুলি নিয়ে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ফ্লাইটে দিল্লি পৌঁছে গেছেন আশিয়ান গ্রুপের চেয়ারম্যান মো. নজরুল ইসলাম ভূঁইয়া।
শাহজালাল বিমানবন্দরে তিন স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা চালু থাকলেও এই বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ অলক্ষ্যে থেকে যাওয়ার ঘটনাটি দেশের প্রধান বিমানবন্দরের নিরাপত্তা কাঠামোর চরম ভঙ্গুর চিত্র ফুটিয়ে তুলেছে। ঢাকা পার হলেও শেষ রক্ষা হয়নি, ভারতের দিল্লি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের স্ক্যানারে নজরুলের ব্যাগে তাজা গুলির অস্তিত্ব ধরা পড়ার পর পুরো বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে এবং আন্তর্জাতিক স্তরে তোলপাড় সৃষ্টি হয়।
অনুসন্ধানে জানা যায়, গত ১৬ জুলাই নজরুল ইসলাম ভূঁইয়া তার ছেলে আরিদিন ভূঁইয়া ও মেয়ে নুসরাত জুবাইয়ারাকে নিয়ে দিল্লি যাওয়ার উদ্দেশে শাহজালাল বিমানবন্দরে আসেন। তারা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বিজি-৩৯৭ ফ্লাইটের যাত্রী ছিলেন। সেদিন বিমানবন্দরের সাধারণ যাত্রীদের মতো স্বাভাবিক প্রবেশপথ ব্যবহার না করে, বিমান বাংলাদেশের দুই কর্মকর্তা জিএসএ মিজানুর রহমান ও জিএসএস সাইফুল ইসলামের সহায়তায় ‘হেভি লাগেজ গেট-৬’ দিয়ে অনৈতিক ও নিয়মবহির্ভূত প্রটোকল নিয়ে তারা ভেতরে ঢোকেন। এর ফলে শুরুতেই প্রাথমিক স্তরের স্বাভাবিক তল্লাশি এড়িয়ে যেতে সক্ষম হন নজরুল ইসলাম ও তার পরিবার।
পরবর্তীতে ইমিগ্রেশন ও চেক-ইন শেষ করে চূড়ান্ত নিরাপত্তা তল্লাশির জন্য তারা যখন সি-০১ নম্বর বোর্ডিং ব্রিজ এলাকায় যান, সেখানেও চরম দায়িত্বজ্ঞানহীনতার পরিচয় দেন সিকিউরিটি কর্মীরা। নিয়ম অনুযায়ী হ্যান্ড ব্যাগ নিবিড়ভাবে স্ক্যানিং করার কথা থাকলেও দায়িত্বপ্রাপ্ত স্ক্রিনাররা ব্যাগে রাখা ৩১ রাউন্ড গুলি শনাক্ত করতেই পারেননি। সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে তদন্ত কর্মকর্তারা আরও একটি বিস্ময়কর তথ্য দেখতে পান। সেখানে দেখা যায়, যে সময় নজরুল ইসলামের ব্যাগ স্ক্যানিং মেশিনে যাচ্ছিল, ঠিক তখন সিকিউরিটি স্ক্যানার এএসজি আরিফুর রহমান তার পেশাগত কাজে নজর না দিয়ে আশিয়ান গ্রুপের চেয়ারম্যানের সঙ্গে কুশল বিনিময় ও করমর্দনে ব্যস্ত ছিলেন। এই কুশল বিনিময়ের ফাঁকেই বিমান চালনার ক্ষেত্রে অন্যতম বড় হুমকি—তাজা গোলাবারুদ পার হয়ে যায় আন্তর্জাতিক ফ্লাইটে।
দিল্লি বিমানবন্দরে বিমানটি অবতরণের পর সেখানকার ইমিগ্রেশন ও নিরাপত্তা স্ক্যানিং পার হওয়ার সময় ধরা পড়েন নজরুল ইসলাম ভূঁইয়া। দিল্লি বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ ব্যাগের ভেতরে সারিবদ্ধ ৩১ রাউন্ড গুলি দেখে সাথে সাথে তা আটকে দেয় এবং শাহজালাল বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষকে আনুষ্ঠানিকভাবে তথ্যটি জানায়। দিল্লিতে ঘটনাটি নিশ্চিত হওয়ার পরপরই ঢাকায় তদন্তে নামে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)। প্রাথমিক তদন্তেই এয়ারলাইন্সকর্মীদের ‘অবৈধ প্রটোকল’ প্রদান এবং সিকিউরিটি স্ক্রিনারদের মারাত্মক গাফিলতির সত্যতা বেরিয়ে আসে।
শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক এস এম রাগিব সামাদ এ বিষয়ে স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, স্ক্রিনারের অবহেলা এবং নিয়ম ভেঙে অবৈধ প্রটোকল দেওয়ার প্রমাণ মেলায় যুক্ত কর্মী ও কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করে সদর দপ্তরে প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছে। একই সাথে স্ক্যানার মেশিনের কার্যকারিতা কিংবা কর্মীদের সদিচ্ছা নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় পুরো বিষয়টি নিয়ে উচ্চপর্যায়ের পর্যালোচনা চলছে। আন্তর্জাতিক রুটের একটি ফ্লাইটে তাজা গুলি নিয়ে যাত্রী উঠে যাওয়ার এই চাঞ্চল্যকর ঘটনায় নজরুল ইসলামের কোনো বক্তব্য না মিললেও, এটি শাহজালাল বিমানবন্দরের আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মানকে বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে ফেলে দিয়েছে।
আপনার মতামত লিখুন :