রেলপথের ‘ব্লেড রান’: উন্নয়ন প্রকল্পের হাজার কোটি টাকার আড়ালে হরিলুট ও যাত্রী নিগ্রহের অন্ধকার অধ্যায়


​বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশের সময় : অগাস্ট ১৬, ২০২৬, ২:০১ অপরাহ্ন

বাংলাদেশ রেলওয়ে যেন এক অনন্ত অনিয়মের অভয়ারণ্য। হাজার হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প, ঝকঝকে নতুন কোচ কেনাকাটা আর প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরির আড়ালে ঢাকা পড়ে রয়েছে গভীর দুর্নীতি, কারিগরি অজ্ঞতা এবং চরম যাত্রী হয়রানির নির্লজ্জ বাস্তবতা।

সম্প্রতি রেল মন্ত্রণালয়ের সাবেক অতিরিক্ত সচিব মো. মাহবুব কবির মিলনের বিস্ফোরক ফেসবুক পোস্ট রেল খাতের এই ক্ষতবশতকে আবারও নগ্নভাবে সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে। প্রশাসনিক আমলাতন্ত্রের প্রাণকেন্দ্র থেকে আসা এই কড়া সমালোচনা স্পষ্ট করে দিয়েছে—রেল সার্ভিস নয়, বরং এটি এখন অদক্ষতা ও কমিশন বাণিজ্যের এক নিরাপদ স্বর্গরাজ্য।

​১. মেগা প্রকল্পের আড়ালে ‘কমিশন বাণিজ্য’ ও অর্থ পাচার

​রেলওয়ের বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্প মানেই যেন শত শত কোটি টাকার বাজেট। কিন্তু এই মেগা প্রজেক্টগুলোর আসল সুফল কতটুকু পাচ্ছেন সাধারণ যাত্রী? সাবেক অতিরিক্ত সচিবের সরাসরি অভিযোগ—ঘুষ ও গ্রাহক হয়রানির পাশাপাশি এসব প্রকল্পে চলে বিপুল অঙ্কের কমিশন বাণিজ্য। সাধারণ মানুষের চোখের আড়ালে এই কমিশন ও অনৈতিক অর্থের ভাগ-বাটোয়ারা হয়ে তা বিদেশে পাচার পর্যন্ত হয়ে যাচ্ছে। উন্নয়ন তো দূরের কথা, মেগা প্রকল্পের নামে মূলত চলছে লুটপাটের মহোৎসব।

​২. মন্ত্রণালয়ের কারিগরি অজ্ঞতা ও তদারকির অভাব

​যে কর্মকর্তারা রেল পরিচালনা ও তদারকির দায়িত্বে আছেন, তাদের সর্বনিম্ন কারিগরি জ্ঞান নিয়েও এখন বড় প্রশ্ন উঠে গেছে।

​স্পিড ও ট্র্যাক জ্ঞান: রানিং স্পিড (Running Speed) ও সেকশনাল স্পিডের (Sectional Speed) মৌলিক পার্থক্য সম্পর্কে মন্ত্রণালয়ের কর্তাব্যক্তিদের ধারণা কতটা স্পষ্ট, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
​কোয়ালিটি অডিট শূন্যের কোঠায়: নতুন রেলপথ চালুর পর বেডিং অডিট করা বা লাইনে ব্যবহৃত পাথরের সঠিক পুরুত্ব মেপে দেখার মতো প্রাথমিক নজরদারিও উধাও।
​কোচের রহস্যময় গায়েব: প্রতি ঈদের আগে কোটি কোটি টাকা খরচ করে শত শত কোচ মেরামত করা হয়। ঈদের পর সেই কোটি টাকার কোচগুলো কোথায় গায়েব হয়ে যায়, তার কোনো হিসেব নেই। কোনো অনিয়ম বা দুর্নীতির তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির কোনো নজির আজ পর্যন্ত তৈরি করতে পারেনি রেলওয়ে।
​৩. স্বার্থের সংঘাত: মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তর একই ছাদের নিচে

​প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও স্বাধীনতার তোয়াক্কা না করে রেল মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ রেলওয়ে অধিদপ্তরকে একই ভবনে বসিয়ে রাখা হয়েছে। ফলে তদারককারী সংস্থা (মন্ত্রণালয়) এবং বাস্তবায়নকারী সংস্থা (অধিদপ্তর)-র মধ্যে যে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা থাকার কথা ছিল, তা সম্পূর্ণ ভেস্তে গেছে। একই ছাদের নিচে অবস্থানের কারণে অনিয়ম ও ফাইলচাপা দেওয়ার সংস্কৃতি আরও জোরদার হয়েছে।

​৪. ছাদে যাত্রী পরিবহন: দায়িত্ব এড়ানো নাকি প্রাতিষ্ঠানিক হত্যা?

​ঈদের সময় বা স্বাভাবিক সময়ে ট্রেনের ছাদে গাদাগাদি করে যাত্রী পরিবহন এখন এক নিয়মিত দৃশ্য। সাবেক রেল সচিব এ বিষয়ে তিনটি চাঁছাছোলা প্রশ্ন তুলে ধরেছেন—
১. পুরো দেশের সব মানুষকে বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার দায়ভার কি এককভাবে রেলওয়ের?
২. রেলওয়ে কি আদৌ ট্রেনের ছাদে যাত্রী পরিবহন বন্ধ করতে চায়?
৩. ছাদ থেকে পড়ে কোনো যাত্রীর মৃত্যু হলে সেই দায় কি রেল কর্তৃপক্ষ নেবে?

​যদি রেলওয়ে ট্রেনের ছাদে যাত্রী ওঠা সত্যিই বন্ধ করতে চায়, তবে তা করার মতো কঠোর ও নিশ্ছিদ্র প্রশাসনিক ব্যবস্থা কেন নেওয়া হচ্ছে না? আর যদি ছাদে যাত্রী চড়তে দেওয়াকেই নিয়ম বানিয়ে ফেলা হয়, তবে দুর্ঘটনায় নিহতের পরিবারকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ এবং তাদের যোগ্য সন্তানদের রেলে চাকরি দেওয়ার মতো প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব রেলকে নিতে হবে।

​৫. নামমাত্র সেবা ও চরম যাত্রী নিগ্রহ

​রেলসেবার কঙ্কালসার চেহারা ফুটে ওঠে যখন ট্রেনের পানির ট্যাংক ব্যবহার করে যাত্রীকে কাপড় ধুতে দেখা যায়! কোচের ভেতর পর্যাপ্ত পানি নেই, ওয়াশরুম নোংরা, এসি অকেজো—অথচ টিকিটের পেছনে যাত্রীর কাছ থেকে আদায় করা হচ্ছে চড়া মূল্য। সেবার নামে এটি সরাসরি যাত্রী হয়রানি ও প্রতারণা ছাড়া আর কিছুই নয়।

​এখন সময় কঠোর জবাবদিহিতার

​বাংলাদেশ রেলওয়ে আজ কোনো সেবামূলক প্রতিষ্ঠান নয়, বরং এটি প্রশাসনিক স্থবিরতা ও দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছে। সাবেক এই জ্যেষ্ঠ সরকারি কর্মকর্তার ক্ষোভ ও প্রশ্নগুলো প্রমাণ করে যে, ভেতরের অবস্থা কতটা পচে গেছে। তিনি আক্ষেপ করে লিখেছেন, সুযোগ পেলে তিনি “বাংলাদেশ রেলওয়ের ওপর একটি পিএইচডি করার চেষ্টা করতেন”—যা মূলত রেলের সার্বিক অব্যবস্থাপনার ওপর এক চরম কটাক্ষ।

​এখনই যদি মেগা প্রকল্পের কমিশন বাণিজ্য বন্ধ, কারিগরি তদারকি জোরদার এবং ট্রেনের ছাদে ঝুঁকিপূর্ণ ভ্রমণ বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তবে হাজার হাজার কোটি টাকা ঢালেও এই রেল কোনদিন সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারবে না। কর্তৃপক্ষের ঘুম ভাঙবে কবে?