কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীতে ‘টুপটুপ রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড রিসোর্টে’ ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের সময় কর্মীদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীরা। তাঁদের অভিযোগ, আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার সময় রিসোর্টের কয়েকজন কর্মী মালিকের পোষা দুটি কুকুর ও চারটি বিড়াল উদ্ধারে ব্যস্ত ছিলেন। অথচ ভেতরে থাকা পর্যটকদের দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ যথেষ্ট ছিল কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
শনিবার (১৭ অক্টোবর) সকাল ৭টার দিকে আগুন লাগার সময়কার পরিস্থিতি বর্ণনা করে পাটোয়ারটেক এলাকার বাসিন্দা মো. মামুন এসব অভিযোগ করেন। তাঁর ভাষ্য, আগুন ছড়িয়ে পড়ার সময় রিসোর্টের নিরাপত্তাকর্মী মো. কফিল উদ্দিন কর্মীদের বাইরে চলে যেতে বলছিলেন। একই সঙ্গে তাঁকে পোষা কুকুরগুলোর খোঁজ করতেও দেখা যায়।
মামুনের দাবি, সে সময় নিরাপত্তাকর্মীকে চিৎকার করে ‘কুকুর কই, কই?’ বলতে শোনা যায়। রিসোর্টের দ্বিতীয় তলায় মালিকের দুটি কুকুর ও চারটি বিড়াল ছিল বলে জানান তিনি। আগুন লাগার পর নিরাপত্তাকর্মীসহ পাঁচজন কর্মী প্রাণীগুলো নিয়ে বাইরে চলে আসেন বলেও দাবি করেন এই প্রত্যক্ষদর্শী।
রিসোর্টের কাছেই বসবাস করেন মামুন। তিনি বলেন, ‘বিস্ফোরণের শব্দ শুনে ঘুম ভেঙে যায়। বাইরে বেরিয়ে দেখি, রিসোর্টে আগুন জ্বলছে। কয়েকজন কর্মী কুকুর-বিড়াল নিয়ে ছোটাছুটি করছেন।’
মামুন আরও বলেন, রিসোর্টের মালিক তানভীর সুলতান মিয়াকে তিনি আগে অনেকবার পোষা কুকুর নিয়ে সৈকতে হাঁটতে দেখেছেন।
পর্যটকদের উদ্ধারে উদ্যোগ নিয়ে প্রশ্ন
একই এলাকার বাসিন্দা নুর হোসেনও আগুনের সময় কর্মীদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁর অভিযোগ, আগুনের মধ্যে পোষা প্রাণী উদ্ধারের তৎপরতা দেখা গেলেও পর্যটকদের উদ্ধারে যথেষ্ট উদ্যোগ চোখে পড়েনি।
নুর হোসেন বলেন, মানুষের জীবন বাঁচানোই তখন সবচেয়ে জরুরি ছিল। আগুনের মধ্যে থাকা মানুষকে খুঁজে বের করে নিরাপদ স্থানে নেওয়ার চেষ্টা আরও জোরালো হওয়া প্রয়োজন ছিল। দ্রুত উদ্ধার তৎপরতা চালানো গেলে আরও কিছু প্রাণ বাঁচানো সম্ভব হতো কি না, সেই প্রশ্নও তুলেছেন তিনি।
তবে প্রত্যক্ষদর্শীদের এসব অভিযোগের বিষয়ে রিসোর্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা যুক্ত করা প্রয়োজন। আগুনের সময় কর্মীরা কী ধরনের উদ্ধার তৎপরতা চালিয়েছিলেন, তা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া জরুরি।
মালিকসহ চারজনের বিরুদ্ধে মামলা
অগ্নিকাণ্ড ও প্রাণহানির ঘটনায় রিসোর্টের মালিক তানভীর সুলতান মিয়াকে প্রধান আসামি করে চারজনের নাম উল্লেখ করে উখিয়া থানায় মামলা করেছে পুলিশ। মামলার তদন্তের মাধ্যমে আগুনের কারণ, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা এবং সম্ভাব্য দায় নির্ধারণ করা হবে।
উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুর রহমান জানান, প্রধান আসামি তানভীর সুলতান মিয়াসহ অন্য আসামিদের আইনের আওতায় আনতে পুলিশের তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে।
অগ্নিনিরাপত্তা তদারকি নিয়ে ফায়ার সার্ভিসের বক্তব্য
অগ্নিকাণ্ডের পর রিসোর্টটির নিরাপত্তাব্যবস্থা ও অগ্নিনিরাপত্তা তদারকি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে নিয়মিত তদারকির ক্ষেত্রে জনবলসংকটের কথা জানানো হয়েছে।
রিসোর্ট পরিদর্শনে গিয়ে ফায়ার সার্ভিসের লেফটেন্যান্ট কর্নেল আজাদ আনোয়ার বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ রিসোর্টগুলোকে নোটিশ দেওয়া হয়। তবে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে সতর্ক করার পরও কয়েক বছর পর আবার পরিদর্শনে গিয়ে একই ধরনের অনিয়ম দেখা যায়।
তিনি বলেন, ‘ব্যবসায়ীরা নিজেরা সচেতন না হলে এ ধরনের দুর্ঘটনা এড়ানো কঠিন। আমাদের নিজস্বভাবে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার জন্য ম্যাজিস্ট্রেট নেই। কাউকে জরিমানা করতে হলে জেলা প্রশাসকের সঙ্গে সমন্বয় করতে হয়।’
ইনানীর এই অগ্নিকাণ্ডের পর পর্যটনকেন্দ্রের আবাসন ও বিনোদনকেন্দ্রগুলোতে অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা, জরুরি নির্গমনপথ এবং বিপদের সময় পর্যটকদের উদ্ধারে প্রস্তুতি কতটা কার্যকর—সেসব প্রশ্ন নতুন করে সামনে এসেছে। তদন্তে এসব বিষয় খতিয়ে দেখা হলে দুর্ঘটনার কারণ ও দায় নির্ধারণে সহায়ক হতে পারে।
আপনার মতামত লিখুন :