বিশ্বকাপের মঞ্চে আবারও ফিরে এলো সেই চিরচেনা রোমাঞ্চ, আবেগ আর ঐতিহাসিক বৈরিতার আবহ। অতিরিক্ত সময়ের চরম নাটকীয়তায় সুইজারল্যান্ডকে ৩-১ গোলে হারিয়ে টানা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে পা রেখেছে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা।
আর সেখানে শেষ চারে আলবিসেলেস্তেদের জন্য অপেক্ষা করছে তাদের চিরশত্রু ইংল্যান্ড, যারা অন্য কোয়ার্টার ফাইনালে আরলিং হালান্ডের নরওয়েকে ২-১ গোলে হারিয়ে সেমির টিকিট কেটেছে।
কানসাসের মাঠে সুইসদের বধ করার পরপরই ফুটবল বিশ্বে শুরু হয়ে গেছে ‘আর্জেন্টিনা বনাম ইংল্যান্ড’ মহারণের কাউন্টডাউন। তবে মাঠের বাইরের এই তুমুল রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক উত্তেজনাকে পাত্তাই দিচ্ছেন না আর্জেন্টিনার মাস্টারমাইন্ড কোচ লিওনেল স্কালোনি।
নরওয়ে নাকি ইংল্যান্ড? স্কালোনির সোজাসাপ্টা জবাব
ম্যাচ শেষে সংবাদ সম্মেলনে স্কালোনির কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, সেমিফাইনালে প্রতিপক্ষ হিসেবে নরওয়ে নাকি ইংল্যান্ড—কাকে চেয়েছিলেন তিনি? ফুটবল রোমান্টিকরা যখন ম্যারাডোনার ‘হ্যান্ড অব গড’ কিংবা ফকল্যান্ড যুদ্ধের আবেগ নিয়ে মেতে আছেন, তখন স্কালোনি স্বভাবসুলভভাবেই বাস্তববাদী।
স্কালোনি অকপটে বলেন, “প্রতিপক্ষ ইংল্যান্ড হোক বা নরওয়ে, তা খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। এটি স্রেফ একটি ফুটবল ম্যাচ। এর চেয়ে বেশি কিছু খোঁজার প্রয়োজন নেই। আমরা এমন একটি দলের মুখোমুখি হবো, যারা খুব ভালো ফুটবল খেলে এবং যাদের একজন অসাধারণ কোচ আছেন।”
তিনি আরও যোগ করেন, “সেমিফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে ভাগ্যের সহায়তাও লেগেছে। আমাদের বাস্তববাদী হতে হবে, দলের উন্নতির অনেক জায়গা রয়েছে। তবে জয় নিয়ে সেই বিষয়গুলো বিশ্লেষণ করা সব সময়ই ভালো। এই দল যা অর্জন করেছে তা ঐতিহাসিক। আবারও সেমিফাইনালে ওঠা নিঃসন্দেহে ইতিহাস।”
ড্রেসিংরুম থেকে গ্যালারি: ইংলিশ বিরোধী স্লোগানে মুখরিত
কোচ স্কালোনি ম্যাচটিকে ‘স্রেফ একটি ফুটবল ম্যাচ’ হিসেবে দেখলেও, খেলোয়াড় ও সমর্থকদের আবেগে তা আটকে রাখা যাচ্ছে না। শেষ ষোলোর ম্যাচে মিশরের বিপক্ষে মহানাটকীয় জয়ের পর আর্জেন্টিনার ড্রেসিংরুমে লিওনেল মেসি এবং এমিলিয়ানো মার্টিনেজদের ইংল্যান্ড বিরোধী ‘উস্কানিমূলক’ গান গাইতে দেখা গিয়েছিল।
কানসাসে কোয়ার্টার ফাইনাল জয়ের পরও সেই একই দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি ঘটে। মাঠের ভেতরে খেলোয়াড়রা যখন গ্যালারির সমর্থকদের সাথে উল্লাসে মাতলেন, তখন সবার মুখে মুখরিত হচ্ছিল সেই ঐতিহাসিক স্লোগান—“কো এল কে নো সালতা, এস উন ইংলেস”। বুয়েনস আইরেস থেকে যুক্তরাষ্ট্রের রাস্তা—সবখানেই এখন ইংলিশ বধের স্লোগান।
স্কালোনির মূল চিন্তা: ক্লান্তি ও চোট কাটিয়ে ওঠা
নকআউট পর্বের টানা তিনটি ম্যাচে আর্জেন্টিনার ওপর দিয়ে যে পরিমাণ শারীরিক ও মানসিক ধকল গেছে, তাতে স্কালোনির বর্তমান মূল লক্ষ্য এখন রণকৌশল নয়, বরং খেলোয়াড়দের ফিটনেস। সুইসদের বিপক্ষে ম্যাচটি অতিরিক্ত সময়ে গড়ানোয় ফুটবলারদের ক্লান্তি চরম আকার ধারণ করেছে।
স্কালোনি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, “এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ছেলেদের এনার্জি ফিরিয়ে আনা এবং ভালোভাবে রিকভারি করা। এখন আমাদের শক্তি ফিরে পাওয়াটাই সবচেয়ে জরুরি। আমার মনে হয়, এই মুহূর্তে সেটাই আমাদের সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।”
মহারণের হেড-টু-হেড: পরিসংখ্যান কী বলে?
বিশ্বকাপের মঞ্চে এই দুই পরাশক্তির মুখোমুখি হওয়া মানেই নতুন কোনো ইতিহাসের জন্ম নেওয়া। আন্তর্জাতিক ফুটবলের অফিসিয়াল পরিসংখ্যান অনুযায়ী:
মোট ম্যাচ: দুই দল এখন পর্যন্ত ১৫ বার মুখোমুখি হয়েছে।
ইংল্যান্ডের জয়:
৬টি ম্যাচে শেষ হাসি হেসেছে থ্রি লায়নসরা (যার মধ্যে হ্যারী কেইনের দলের সাম্প্রতিক নরওয়ে বধের আত্মবিশ্বাস রয়েছে)।
আর্জেন্টিনার জয়: ৫টি ম্যাচে জিতেছে আলবিসেলেস্তেরা।
ড্র: বাকি ৪টি ম্যাচ অমীমাংসিত থাকে।
বিশ্বকাপের মঞ্চে: বিশ্বকাপে ৫ বারের দেখায় ইংল্যান্ড জিতেছে ৩টিতে, আর্জেন্টিনা ১টিতে (১৯৮৬ সালের ম্যারাডোনার সেই ম্যাচ) এবং ১৯৯৮ সালের বিখ্যাত ম্যাচটি টাইব্রেকারে জিতেছিল আর্জেন্টিনা।
পরিসংখ্যানের পাতায় ইংল্যান্ড সামান্য এগিয়ে থাকলেও, বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার ঝুলিতে রয়েছে লিওনেল মেসির জাদুকরী ফর্ম এবং যেকোনো পরিস্থিতি থেকে ম্যাচ বের করে আনার অবিশ্বাস্য মানসিকতা।
হালান্ডদের বিদায় করে ফুরফুরে মেজাজে থাকা হ্যারি কেইনের ইংল্যান্ড, নাকি টানা দ্বিতীয়বার ফাইনালের টিকিট কাটতে মরিয়া মেসির আর্জেন্টিনা?
মাঠের বাইরের আবেগের পারদ যতই উপরে উঠুক, কানসাসের ধকল কাটিয়ে কোন দল মাঠের রণকৌশলে শ্রেষ্ঠত্ব দেখাতে পারে, সেটাই এখন দেখার অপেক্ষা।
আপনার মতামত লিখুন :