ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের হামলা জোরদার হওয়ার মধ্যে নিরাপত্তা শঙ্কায় সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানকে এক প্রাসাদ থেকে অন্য প্রাসাদে যেতে হচ্ছে বলে এক প্রতিবেদনে দাবি করেছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বরাতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুবরাজের অবস্থানের জন্য বেছে নেওয়া প্রাসাদগুলোতে কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থার পাশাপাশি বাংকারের সুবিধাও রয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৪১ বছর বয়সী যুবরাজকে সর্বশেষ ৬ অক্টোবর একটি জাতীয় রক্তদান কর্মসূচিতে অংশ নিতে জনসমক্ষে দেখা যায়। এরপর থেকে তাঁকে আর প্রকাশ্যে দেখা যায়নি। সৌদি আরব ও হুতি বিদ্রোহীদের মধ্যে সংঘাত তীব্র হওয়ায় তাঁর নিরাপত্তায় বিশেষ একটি দল নিয়োজিত রয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
রিয়াদে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, বিমানবন্দর বন্ধ
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হুতিরা ড্রোন, ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে সৌদি রাজধানী রিয়াদে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। হামলার কারণে কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। সপ্তাহান্তের হামলার পর বিমানবন্দরটি বন্ধ রাখা হয়েছে এবং গত পাঁচ দিনে সেখানে চারবার হামলা হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
১০ অক্টোবর সৌদি আরবের ওপর গত এক দশকের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ হামলার ঘটনা ঘটে বলে ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে হুতিদের অন্তত একটি ক্ষেপণাস্ত্র রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আঘাত হানে। হামলায় অন্তত ১৩ জন নিহত এবং ৩০০ জন আহত হন বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। আহতদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর।
হামলার বিষয়ে অবগত কর্মকর্তাদের বরাতে সংবাদমাধ্যমটি জানিয়েছে, ইরান যুদ্ধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সংঘাতগুলোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও উপসাগরীয় অঞ্চলে তাদের মিত্রদের ওপর এটি ছিল এককভাবে সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলা। নিহতদের মধ্যে ২৮ বছর বয়সী এক মিসরীয় বিমানবালাও রয়েছেন। ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে তাঁর একটি হাত বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে তাঁর মৃত্যু হয়। হতাহতদের মধ্যে আরও কয়েকজনের অঙ্গহানির ঘটনা ঘটেছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
আকাশ প্রতিরক্ষা নিয়ে উদ্বেগ
হুতিদের ধারাবাহিক হামলায় সৌদি আরবের রাজধানী রক্ষার সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ধেয়ে আসা ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে ব্যবহৃত ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত কমে আসছে। ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরুর পর সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশ আকাশ প্রতিরক্ষায় বিপুলসংখ্যক ইন্টারসেপ্টর ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে। এতে সৌদি আরবের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর চাপ বেড়েছে।
এদিকে সৌদি আরবের জ্বালানিমন্ত্রী প্রিন্স আবদুলআজিজ বিন সালমান সতর্ক করে বলেছেন, হামলার ভয়াবহতা বিবেচনায় নিয়ে এর জবাবও সমান গুরুতর হবে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুতিদের বিরুদ্ধে সৌদি আরবের সঙ্গে যুক্ত হয়ে হামলা চালানোর বিষয়টি বিবেচনা করছেন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সৌদি আরবের মিত্ররাও রিয়াদের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে।
সৌদি-হুতি সংঘাতের পটভূমি
সৌদি আরব ও ইয়েমেনের হুতিদের মধ্যে ২০১৫ সাল থেকে সংঘাত চলছে। ওই বছর ইয়েমেনের সরকারের সমর্থনে দেশটির গৃহযুদ্ধে হস্তক্ষেপ করে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট। ২০২২ সালে দুই পক্ষের মধ্যে একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও সাম্প্রতিক আঞ্চলিক সংঘাতের প্রেক্ষাপটে পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির জানাজা শেষে হুতি নেতাদের নিয়ে তেহরান থেকে আসা একটি উড়োজাহাজ সানার বিমানবন্দরে অবতরণের চেষ্টা করার সময় সৌদি বাহিনী সেখানে হামলা চালায়। এরপর প্রতিশোধ হিসেবে হুতিরা আবার হামলা শুরু করে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
ইরানের সমর্থনপুষ্ট হুতিরা মধ্যপ্রাচ্যে তেহরানের অন্যতম শক্তিশালী সশস্ত্র মিত্র। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই আরব উপদ্বীপের পরিস্থিতির অবনতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, এই সংঘাত কেবল ইসরায়েলকেই লাভবান করবে।
রোববার রাতে সৌদি ও ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা সংঘাতের বিস্তার নিয়ে আলোচনা করেন। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানান, তিনি সামরিক পদক্ষেপের ওপর জোর দেওয়া এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতি উপেক্ষা করার বিরুদ্ধে সতর্ক করেছেন। একই সঙ্গে সৌদি আরব ও হুতিদের মধ্যে সংলাপ শুরু করতে তেহরান সহায়তা করতেও প্রস্তুত বলে জানান তিনি।
সূত্র: ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল, দ্য নিউ আরব।
আপনার মতামত লিখুন :