ইস্টার্ন ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হাইকোর্টের রুল


বাংলার মুখ প্রতিবেদক প্রকাশের সময় : অক্টোবর ১৫, ২০২৬, ৭:২৬ অপরাহ্ন

ইস্টার্ন ব্যাংক পিএলসির (ইবিএল) সাবেক চেয়ারম্যান মো. শওকত আলী চৌধুরীর বিরুদ্ধে ব্যাংক কোম্পানি আইন লঙ্ঘন করে নামে-বেনামে ২০ শতাংশের বেশি শেয়ার নিয়ন্ত্রণের অভিযোগে ব্যবস্থা নিতে কর্তৃপক্ষের নিষ্ক্রিয়তা কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট।
একই সঙ্গে এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্ত প্রতিবেদন ১৫ দিনের মধ্যে আদালতে দাখিল করতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি শওকত আলী চৌধুরীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আবেদন ৩০ দিনের মধ্যে নিষ্পত্তি করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) বিচারপতি শওকত আলী চৌধুরী ও বিচারপতি আব্দুর রহমানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ আদেশ দেন। আদালতে রিটের পক্ষে শুনানি করেন অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ আলী, অ্যাডভোকেট ইশরাত হাসান ও অ্যাডভোকেট বিপ্লব কুমার দাশ।
এর আগে ঢাকা বার অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য এবং ইবিএলের ক্ষুদ্র শেয়ারহোল্ডার অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম জনস্বার্থে রিটটি দায়ের করেন। ব্যাংকিং খাতের আমানতকারী ও শেয়ারবাজারের বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষার উদ্দেশ্যে তিনি আদালতের দ্বারস্থ হন।
শেয়ার নিয়ন্ত্রণে আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ
রিটে বলা হয়েছে, ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর ১৪ক (১) ধারা অনুযায়ী কোনো একক ব্যক্তি, পরিবার বা প্রতিষ্ঠান একটি ব্যাংকের ১০ শতাংশের বেশি শেয়ার ধারণ করতে পারে না। তবে অভিযোগ অনুযায়ী, শওকত আলী চৌধুরী ও তাঁর পরিবার সরাসরি ৯ দশমিক ৯৯ শতাংশ এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আরও ১১ দশমিক ১২ শতাংশসহ মোট ২১ দশমিক ১১ শতাংশ শেয়ার নিয়ন্ত্রণ করছেন। এসব শেয়ারের মূল্য প্রায় ৩৩ কোটি ৬৭ লাখ টাকা বলে রিটে উল্লেখ করা হয়েছে।
রিটকারীর দাবি, বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্তেও শওকত আলী চৌধুরীর ২০ দশমিক ৪৮ শতাংশ শেয়ার নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি উঠে এসেছে। তবে এ বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
প্রক্সি শেয়ারহোল্ডার ব্যবহারের অভিযোগ
রিটে আরও দাবি করা হয়েছে, শওকত আলী চৌধুরী তাঁর পারিবারিক প্রতিষ্ঠান এসএন করপোরেশনের কর্মচারী নইমুল হক, তাঁর স্ত্রী সালমা শিরীন এবং নিজের শ্যালিকা অনিকা তাহজীবকে প্রক্সি বা নামমাত্র শেয়ারহোল্ডার হিসেবে ব্যবহার করেছেন।
অভিযোগ অনুযায়ী, ‘মেসার্স আরুশা অ্যান্ড কোং’ ও ‘আনিকা শেয়ার্স অ্যান্ড সিকিউরিটিজ’ নামের প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এসব শেয়ার নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠান দুটির শেয়ার ধারণের হার যথাক্রমে ৯ দশমিক ৯৮ শতাংশ ও ১ দশমিক ১৪ শতাংশ বলে রিটে উল্লেখ করা হয়েছে। আরুশা অ্যান্ড কোংয়ের সাবেক শেয়ারহোল্ডারদের সঙ্গে শওকত আলী চৌধুরীর পরিবারের সদস্যদের সম্পৃক্ততা এবং ঠিকানার মিল থাকার বিষয়টিও আবেদনে তুলে ধরা হয়েছে।
রিটে দাবি করা হয়েছে, মাত্র এক লাখ টাকা পরিশোধিত মূলধনের আরুশা অ্যান্ড কোং ২০০৯ সালের পর নতুন করে শেয়ার না কিনেও বোনাস শেয়ারের মাধ্যমে বিপুলসংখ্যক শেয়ারের মালিক হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির হাতে থাকা শেয়ারের মূল্য প্রায় ৩৩০ কোটি ৫০ লাখ টাকা এবং প্রতিষ্ঠানটি এ পর্যন্ত ২৪৩ কোটি ২৩ লাখ টাকা নগদ লভ্যাংশ পেয়েছে বলে আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
লভ্যাংশের অর্থ স্থানান্তরের অভিযোগ
রিটকারীর অভিযোগ, শওকত আলী চৌধুরী ইবিএলের চেয়ারম্যান ও পরিচালক পদে থাকাকালে সংশ্লিষ্ট লভ্যাংশ অনুমোদনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এ ছাড়া জমি কেনার অগ্রিম বায়নার কথা দেখিয়ে লভ্যাংশের অর্থ থেকে ৯ কোটি ৯০ লাখ টাকা তাঁর ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাবে এবং ২৭ কোটি ২৫ লাখ টাকা এসএন করপোরেশনে স্থানান্তর করা হয়েছিল বলে রিটে দাবি করা হয়েছে।
রিটে আরও অভিযোগ করা হয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্ত প্রতিবেদন ও সম্ভাব্য শাস্তিমূলক ব্যবস্থা এড়াতে সংশ্লিষ্ট শেয়ার দ্রুত বিক্রির চেষ্টা চলছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে শওকত আলী চৌধুরীর বক্তব্য এই প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।
রিটকারীর আবেদনে বলা হয়েছে, আর্থিক অনিয়ম ও জালিয়াতির অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও পরিবারের সদস্যদের আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য নিষিদ্ধ করার বিধান রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের নিষ্ক্রিয়তার বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে আদালতের হস্তক্ষেপ চাওয়া হয়।
হাইকোর্টের রুল জারি মানেই অভিযোগগুলো চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হওয়া নয়। আদালত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিষ্ক্রিয়তার বৈধতা জানতে চেয়েছেন এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দিয়েছেন।