দেশের সাইবার স্পেসে প্রতারণার ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে, যেখানে বিশেষ করে বয়স্ক মানুষ ও গৃহিণীরা বেশি ঝুঁকির মুখে পড়ছেন। বিভিন্ন থানায় দায়ের হওয়া একাধিক মামলার তথ্য ও তদন্ত সংশ্লিষ্টদের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, মোবাইল ব্যাংকিং, অনলাইন বিনিয়োগ, ভুয়া বিজ্ঞাপন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে সংগঠিত চক্রগুলো এই শ্রেণির মানুষকে লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, প্রতারকরা বিভিন্ন কৌশলে প্রথমে ভুক্তভোগীদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করে এবং ধাপে ধাপে তাদের আস্থা অর্জন করে। চাকরির প্রলোভন, অনলাইনে সহজ আয়ের সুযোগ, ভুয়া লটারি, বিদেশ থেকে উপহার পাঠানোর প্রতিশ্রুতি কিংবা ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বন্ধ হয়ে যাওয়ার ভয় দেখিয়ে ব্যক্তিগত তথ্য ও অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
তদন্তে উঠে এসেছে, প্রযুক্তি ব্যবহারে সীমিত দক্ষতা এবং অনলাইন নিরাপত্তা সম্পর্কে অজ্ঞতা এই প্রতারণার অন্যতম প্রধান কারণ। বিশেষ করে গৃহিণী ও বয়স্করা অনেক সময় প্রযুক্তিগত যাচাই-বাছাই না করেই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন, যা তাদের ঝুঁকিতে ফেলে।
একাধিক ঘটনায় দেখা গেছে, প্রতারকরা প্রথমে ছোট অঙ্কের অর্থ ফেরত দিয়ে বিশ্বাস তৈরি করে, পরে বড় অঙ্কের বিনিয়োগে উদ্বুদ্ধ করে। রাজধানীর মিরপুরে বসবাসরত এক গৃহিণী অনলাইনে কাজের প্রলোভনে পড়ে ধাপে ধাপে প্রায় ১১ লাখ টাকা হারিয়েছেন। একইভাবে কিস্তিতে গাড়ি কেনার প্রলোভনে এক অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তি কয়েক লাখ টাকা প্রতারকদের হাতে তুলে দেন।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রতারকরা নিজেদের ব্যাংক কর্মকর্তা, মোবাইল অপারেটরের প্রতিনিধি বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য পরিচয় দিয়ে ভুক্তভোগীদের আস্থা অর্জন করে। এরপর ফোন বা বার্তার মাধ্যমে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে চাপ সৃষ্টি করে এবং একপর্যায়ে পিন নম্বর, ওটিপি বা সরাসরি অর্থ আদায় করে নেয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিজিটাল লেনদেনের প্রসার এবং অনলাইন প্ল্যাটফর্মের ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সাইবার প্রতারণার ঝুঁকিও বাড়ছে। আর্থিক লেনদেনে সচেতনতা ও ডিজিটাল নিরাপত্তা জ্ঞান না থাকলে সাধারণ মানুষ সহজেই প্রতারণার শিকার হতে পারেন।
এছাড়া সাইবার প্রতারণার শিকার হলে দ্রুত নিকটস্থ থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) বা মামলা করতে হবে। এছাড়া পুলিশের সাইবার ক্রাইম ইউনিটের হটলাইন নম্বর ০১৩২০০১০১৪৬-৪৮-এ অথবা সাইবার পুলিশের বেরিফাইড ফেসবুক পেইজ ‘Cyber Police Centre, CID, Bangladesh police’ অভিযোগ দিতে পারেন ভুক্তভোগীরা।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, এ ধরনের প্রতারণা প্রতিরোধে সচেতনতা বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই। সন্দেহজনক লিংক, অচেনা নম্বর থেকে আসা প্রস্তাব বা অতিরিক্ত লাভের প্রতিশ্রুতি এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে কোনো অবস্থাতেই ব্যক্তিগত তথ্য, পিন নম্বর বা ওটিপি শেয়ার না করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
প্রতারিত হলে দ্রুত নিকটস্থ থানায় সাধারণ ডায়েরি বা মামলা করার পাশাপাশি সাইবার ক্রাইম ইউনিটে অভিযোগ জানানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, সময়মতো পদক্ষেপ নিলে অন্তত আংশিকভাবে ক্ষতি কমানো সম্ভব।
সব মিলিয়ে, সাইবার প্রতারণার ক্রমবর্ধমান এই প্রবণতা দেশের ডিজিটাল নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। প্রযুক্তি ব্যবহারের পাশাপাশি নিরাপত্তা সচেতনতা জোরদার না হলে ভবিষ্যতে এই ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
আপনার মতামত লিখুন :