দেশের বৃহত্তম শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির চেয়ারম্যানসহ পরিচালনা পর্ষদের সব সদস্যকে অপসারণ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ব্যাংকটিকে ঘিরে চলমান অস্থিরতা, গ্রাহকদের আস্থাহীনতা এবং তারল্য সংকটের প্রেক্ষাপটে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
রোববার (১৪ জুন) রাতে বাংলাদেশ ব্যাংক এক বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, ব্যাংক কোম্পানি আইন, ১৯৯১-এর ৪৫ ধারা এবং ৪৭(৩) ধারায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যানসহ সব পরিচালকের নিয়োগ বাতিল করা হয়েছে। এ সিদ্ধান্ত ব্যাংকের স্বার্থ, আমানতকারীদের সুরক্ষা এবং জনস্বার্থ বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংক আরও জানিয়েছে, ব্যাংক কোম্পানি আইনের ৪৭(৩) ধারা অনুযায়ী কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ জহির হোসেন সাময়িকভাবে পরিচালনা পর্ষদের সব ক্ষমতা প্রয়োগ ও দায়িত্ব পালন করবেন।
কেন এই সিদ্ধান্ত?
ইসলামী ব্যাংকে সাম্প্রতিক সময়ে নেতৃত্ব পরিবর্তনকে কেন্দ্র করে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়। গত ২৪ মে ব্যাংকের চেয়ারম্যান অধ্যাপক এম. জুবায়দুর রহমান পদত্যাগ করলে একই দিন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর মো. খুরশীদ আলমকে নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।
এই নিয়োগের পর থেকেই ব্যাংকের একাংশ গ্রাহক, কর্মকর্তা, শেয়ারহোল্ডার এবং ‘সচেতন গ্রাহক ফোরাম’-এর ব্যানারে আন্দোলন শুরু হয়। আন্দোলনকারীরা চেয়ারম্যানের অপসারণসহ সাত দফা দাবি উত্থাপন করেন।
পরিস্থিতি ক্রমেই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। ব্যাংকের বিভিন্ন শাখা ও প্রধান কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালিত হয়। গত ১ জুন আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটে।
আস্থাহীনতা ও তারল্য সংকট
নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগের পর গ্রাহকদের মধ্যে আস্থাহীনতা তৈরি হওয়ায় ব্যাপক হারে আমানত উত্তোলন শুরু হয়। কয়েক দিনের মধ্যে ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকার আমানত তুলে নেওয়া হয়, যা ব্যাংকের তারল্য ব্যবস্থাপনায় চাপ সৃষ্টি করে।
এ অবস্থায় বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি ইসলামী ব্যাংককে জরুরি তারল্য সহায়তা দেয় এবং ব্যাংকের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণের জন্য একজন পর্যবেক্ষকও নিয়োগ করে।
সংসদেও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু
ইসলামী ব্যাংকের পরিস্থিতি জাতীয় সংসদেও আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে। বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান সতর্ক করে বলেন, ইসলামী ব্যাংকের ওপর মানুষের আস্থা নষ্ট হলে তা দেশের সামগ্রিক ব্যাংকিং খাত এবং অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
তিনি বলেন, ব্যাংকিং খাতে আস্থা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এই আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হলে রেমিট্যান্স প্রবাহসহ দেশের আর্থিক ব্যবস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয়সমূহ
ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যানসহ সব পরিচালক অপসারিত।
বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাংক কোম্পানি আইনের আওতায় সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ জহির হোসেন সাময়িকভাবে পর্ষদের দায়িত্ব পালন করবেন।
চেয়ারম্যান নিয়োগকে কেন্দ্র করে কয়েক সপ্তাহ ধরে আন্দোলন চলছিল।
গ্রাহকদের আমানত উত্তোলনের কারণে ব্যাংক তারল্য সংকটে পড়ে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ইতোমধ্যে তারল্য সহায়তা ও পর্যবেক্ষক নিয়োগ করেছিল।
এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে ইসলামী ব্যাংকের চলমান সংকট নিরসন, গ্রাহকদের আস্থা পুনরুদ্ধার এবং ব্যাংকটির স্বাভাবিক কার্যক্রম ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
আপনার মতামত লিখুন :