ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ধসে বিপর্যস্ত চট্টগ্রাম-কক্সবাজার, দুই দিনে নিহত ১১


বাংলার মুখ প্রতিবেদক প্রকাশের সময় : জুলাই ৭, ২০২৬, ৬:৩৬ অপরাহ্ন

টানা ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ধসে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার অঞ্চলে ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। জলাবদ্ধতায় ৩৩টি ইউনিয়ন প্লাবিত হয়ে লাখো মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েছে।
ট্রেন ও বিমান চলাচলে বিঘ্ন ঘটেছে, সেন্ট মার্টিন নৌপথে সব ধরনের নৌযান চলাচল বন্ধ রাখা হয়েছে। সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে কক্সবাজারে, যেখানে গত দুই দিনে পাহাড়ধসে অন্তত ১১ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের মধ্যে নারী ও শিশুর সংখ্যাই বেশি।

সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটেছে উখিয়ার রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে। রোববার গভীর রাত থেকে সোমবার ভোরের মধ্যে উখিয়ার ৭, ১১ ও ১৫ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পাহাড়ধসে আটজন নিহত হন। একই সময়ে কক্সবাজার শহরের ছাত্তারঘোনা এলাকায় পাহাড়ধসে মারা যান স্থানীয় বাসিন্দা আলী আকবর। এছাড়া সোমবার পেকুয়া উপজেলার টৈটং ইউনিয়নে পাহাড়ধসে মিনহাজ উদ্দিন (৭) নামে এক শিশুর মৃত্যু হয় এবং মঙ্গলবার দুপুরে কক্সবাজার সদরের দরিয়ানগরে আরেকটি পাহাড়ধসে এক নারীর প্রাণহানি ঘটে। এ ঘটনায় আরও চারজন আহত হয়েছেন।

সবচেয়ে হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটে উখিয়ার ১৫ নম্বর জামতলী রোহিঙ্গা ক্যাম্পে। গভীর রাতে পাহাড়ের বিশাল অংশ ধসে পড়ে মোহাম্মদ কামাল হোসাইনের পরিবারের ঘরের ওপর। এতে কামাল হোসাইন, তার স্ত্রী হুমায়রা বেগম এবং চার বছরের ছেলে মোহাম্মদ আনাস নিহত হন। একই ঘরে থাকা পরিবারের আরও সাত সদস্য আহত অবস্থায় প্রাণে বেঁচে যান। পরে ৭ ও ১১ নম্বর ক্যাম্পেও পৃথক পাহাড়ধসে আরও পাঁচজনের মৃত্যু হয়।

উখিয়া ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তা ডলার ত্রিপুরা জানান, দুর্গম ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশের মধ্যেও রাতভর উদ্ধার অভিযান চালিয়ে নিহতদের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. অহিদুর রহমান বলেন, উদ্ধার হওয়া মরদেহগুলো ময়নাতদন্ত শেষে স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হবে। একই সঙ্গে পাহাড়ের পাদদেশ ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় অবস্থান না করার জন্য সবাইকে সতর্ক করা হয়েছে।

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বসবাসকারী শরণার্থীরা জানান, বর্ষা এলেই তাদের জীবন আতঙ্কে ভরে ওঠে। পাহাড় কেটে তৈরি ঢালে নির্মিত অস্থায়ী ঘরগুলো যেকোনো সময় ধসে পড়তে পারে। অনেক পরিবার ইতোমধ্যেই স্বজন হারিয়েছে, আবার অনেকে ঘরবাড়ি হারিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে। শুধু রোহিঙ্গা ক্যাম্প নয়, কক্সবাজার সদর, রামু ও উখিয়ার পাহাড়ঘেরা এলাকায় প্রায় তিন লাখ মানুষ এখনও ভূমিধসের ঝুঁকিতে বসবাস করছে।

শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, স্থানীয় কিছু ব্যক্তি ও রোহিঙ্গাদের অবৈধ পাহাড় কাটার কারণে বহু এলাকা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তার ভাষায়, এটি শুধু একটি দুর্ঘটনা নয়, বরং মানবসৃষ্ট বিপর্যয়। অবৈধভাবে পাহাড় কাটার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।

এদিকে টানা বর্ষণের কারণে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের বিস্তীর্ণ এলাকা এখনও পানির নিচে রয়েছে। বিভিন্ন সড়কে যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে, রেল যোগাযোগে বিলম্ব হচ্ছে এবং বৈরী আবহাওয়ার কারণে সেন্ট মার্টিনগামী নৌযান চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। প্রশাসন ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।