সকালে দাঁত ব্রাশ, বোতলজাত পানি পান, অফিসে যাওয়ার পথে ধুলাবালি কিংবা প্রতিদিনের খাবার—দৈনন্দিন জীবনের এসব সাধারণ অভ্যাসের মধ্য দিয়েই অজান্তে মানুষের শরীরে প্রবেশ করছে অতি ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা বা মাইক্রোপ্লাস্টিক।
খালি চোখে দেখা না গেলেও সাম্প্রতিক গবেষণায় এই কণার উপস্থিতি মানুষের রক্ত, ফুসফুস, যকৃত, প্লাসেন্টা এমনকি মস্তিষ্কের টিস্যুতেও শনাক্ত হয়েছে। ফলে পরিবেশগত সমস্যা ছাড়িয়ে এটি এখন জনস্বাস্থ্যের বড় উদ্বেগে পরিণত হয়েছে।
মাইক্রোপ্লাস্টিক কী?
মাইক্রোপ্লাস্টিক হলো ৫ মিলিমিটারের কম আকারের প্লাস্টিক কণা। এগুলো দুইভাবে তৈরি হয়—
শিল্পকারখানায় শুরু থেকেই ক্ষুদ্র আকারে উৎপাদিত প্লাস্টিক কণা।
প্লাস্টিকের বোতল, পলিথিন, খাদ্য মোড়ক, টায়ার, সিনথেটিক কাপড়সহ বিভিন্ন প্লাস্টিকজাত পণ্য রোদ, তাপ, ঘর্ষণ ও পরিবেশগত প্রভাবে ভেঙে ক্ষুদ্র কণায় পরিণত হলে।
একবার পরিবেশে ছড়িয়ে পড়লে এসব কণা সহজে নষ্ট হয় না এবং দীর্ঘদিন মাটি, নদী, সমুদ্র ও বাতাসে থেকে খাদ্যচক্রে প্রবেশ করে।
কীভাবে শরীরে প্রবেশ করে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, মাইক্রোপ্লাস্টিক মূলত তিনটি পথে শরীরে ঢোকে—
খাবারের মাধ্যমে (মাছ, লবণ, চা-ব্যাগ, কিছু খাদ্যপণ্য)
পানির মাধ্যমে (বোতলজাত ও কলের পানি)
শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে (বাতাসে ভাসমান ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা)
এ ছাড়া গরম খাবার প্লাস্টিকের পাত্রে রাখা বা প্লাস্টিকের বোতলে দীর্ঘ সময় পানি সংরক্ষণ করলেও খাবার ও পানীয়তে প্লাস্টিক কণা মিশে যেতে পারে।
কেন উদ্বেগ বাড়ছে?
গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, মাইক্রোপ্লাস্টিক শুধু প্লাস্টিক কণাই নয়, এর সঙ্গে থাকা বিভিন্ন রাসায়নিকও শরীরে প্রবেশ করতে পারে। বিজ্ঞানীরা সম্ভাব্য যেসব ঝুঁকির কথা বলছেন, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে—
প্রদাহ ও কোষের ক্ষতি
অক্সিডেটিভ স্ট্রেস
হরমোনের ভারসাম্যহীনতা
অন্ত্রের উপকারী জীবাণুর ভারসাম্য নষ্ট হওয়া
প্রজননস্বাস্থ্যের সমস্যা
হৃদ্রোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি
তবে দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যপ্রভাব সম্পর্কে আরও বিস্তৃত গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
কারা বেশি ঝুঁকিতে?
শিশু
গর্ভবতী নারী
বয়স্ক ব্যক্তি
দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত মানুষ
বিশেষ করে শিশুদের শরীর বিকাশমান হওয়ায় তাদের ওপর এর সম্ভাব্য প্রভাব বেশি হতে পারে।
বাংলাদেশে কেন নতুন করে আলোচনায়?
সম্প্রতি দেশের বাজারে বিক্রি হওয়া টুথপেস্ট, সয়াবিন তেল ও দুধে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি শনাক্ত হওয়ায় বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। গবেষকরা বলছেন, প্লাস্টিক বর্জ্যের অপর্যাপ্ত ব্যবস্থাপনা, একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের ব্যাপক ব্যবহার এবং পুনর্ব্যবহারের সীমাবদ্ধতা এই দূষণ বাড়াচ্ছে।
পুরোপুরি এড়ানো কি সম্ভব?
বর্তমান পরিস্থিতিতে সম্পূর্ণভাবে মাইক্রোপ্লাস্টিক এড়িয়ে চলা প্রায় অসম্ভব। তবে সচেতনতা বাড়িয়ে শরীরে এর প্রবেশের পরিমাণ কমানো সম্ভব।
ঝুঁকি কমাতে যা করবেন
কাচ বা স্টেইনলেস স্টিলের বোতল ও খাবারের পাত্র ব্যবহার করুন।
গরম খাবার প্লাস্টিকের পাত্রে রাখবেন না বা গরম করবেন না।
একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিকের ব্যবহার কমান।
নিরাপদ ও মানসম্মত পানি ব্যবহার করুন।
ঘরের ধুলাবালি নিয়মিত পরিষ্কার করুন।
সিনথেটিকের পরিবর্তে সুতি ও প্রাকৃতিক তন্তুর পোশাক ব্যবহার করুন।
টুথপেস্ট ও প্রসাধনী কেনার আগে উপাদান সম্পর্কে সচেতন থাকুন।
প্লাস্টিক বর্জ্য যথাযথভাবে নিষ্পত্তি ও পুনর্ব্যবহারে গুরুত্ব দিন।
মাইক্রোপ্লাস্টিক চোখে দেখা যায় না, কিন্তু এর প্রভাব ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যক্তিগত সচেতনতার পাশাপাশি প্লাস্টিক ব্যবহারে কার্যকর নীতিমালা, উন্নত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, শিল্পকারখানার কঠোর নজরদারি এবং আরও বৈজ্ঞানিক গবেষণাই এই অদৃশ্য দূষণের ঝুঁকি কমানোর প্রধান উপায়।
আপনার মতামত লিখুন :