চট্টগ্রামের রূপালী চত্বরে মানববন্ধনের আয়োজন

আইয়ুব বাচ্চুর গান ও স্মৃতি বিকৃতি: গুরুতর অভিযোগ


দৈনিক বাংলার মুখ ডেস্ক প্রকাশের সময় : অগাস্ট ২৮, ২০২৬, ৮:২০ পূর্বাহ্ন
<h5>চট্টগ্রামের রূপালী চত্বরে মানববন্ধনের আয়োজন</h5> <h3>আইয়ুব বাচ্চুর গান ও স্মৃতি বিকৃতি: গুরুতর অভিযোগ</h3>

কিংবদন্তি ব্যান্ড সংগীতশিল্পী আইয়ুব বাচ্চুর মৃত্যুর পর তার সুর, গান ও এলআরবি ব্যান্ডের উত্তরাধিকার (লিগ্যাসি) সংরক্ষণ নিয়ে তৈরি হয়েছে চরম বিতর্ক ও অসন্তোষ। সম্প্রতি ‘উত্তরাধিকার’ বা ‘এবি ফাউন্ডেশনে’র ব্যানারে প্রকাশিত উদ্যোগ ও এবি মিউজিয়াম ফান্ডরাইজিং প্রজেক্টের নামে আইয়ুব বাচ্চুর গান রিমেক/বিকৃতি করার অভিযোগ উঠেছে। শেষপর্যন্ত অ্যালবামটি বাতিলের জন্য আইয়ুব বাচ্চু স্মরণে চট্টগ্রামে স্থাপিত রূপালী চত্বরে মানববন্ধনের আয়োজন করছে সর্বস্তরের ভক্ত-শ্রোতা-মিউজিশিয়ানরা।

এ প্রসঙ্গে এলআরবি ব্যান্ডের ড্রামার গোলাম রহমান রোমেল এক বিস্ফোরক ফোনালাপে যুক্ত হন। ফোনালাপে আরও যুক্ত হয়েছেন এলআরবি’র সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ার ও ম্যানেজার শামীম আহমেদ।

রোমেলের মূল অভিযোগ ও ম্যানেজার শামীমের বক্তব্যের বিস্তারিত তুলে ধরা হলো:

​​এলআরবি’র ড্রামার গোলাম রহমান রোমেল ‘উত্তরাধিকার’ প্রজেক্টের তীব্র সমালোচনা করে একে ‘কুরাধিকার’ বলে কটাক্ষ করেছেন। তার মতে, তথাকথিত শিক্ষিত ও দায়িত্বশীল মানুষেরা আইয়ুব বাচ্চুর কালজয়ী সৃষ্টিতে হাত দিয়ে চরম ভুল ও কান্ডজ্ঞানহীনতার পরিচয় দিয়েছেন।

মূল গানের আত্মাকে চরম বিকৃতি, ​অনুপযোগী রিমেক:

আইয়ুব বাচ্চুর গান ও সুর অনন্য (ইউনিক)। ১০০ বছরেও তার গানকে রিমেক করা বা অন্য কারও গাইবার কোনো প্রয়োজন ছিল না। কালজয়ী গান ‘ঘুমন্ত শহর’ রিমেকে যেভাবে পরিবেশন করা হয়েছে, তাতে গানটির মূল আবেগ ও মেজাজ সম্পূর্ণ বিনষ্ট করা হয়েছে। রোমেলের মতে, গানটিকে এমনভাবে পরিবেশন করা হয়েছে, যা সবার জন্য চরম বিভ্রান্তির। বলতে গেলে ২০টি গানই বিকৃত।

​সংগীত সংশ্লিষ্টদের বাদ দেওয়া ও বৈষম্য:

​মূল সদস্য ও গীতিকারদের অবমূল্যায়ন করা হয়েছে অ্যালবামটিতে। যেসব জ্যেষ্ঠ গীতিকার কালজয়ী গানগুলো লিখেছেন এবং এলআরবি’র যেসব সদস্য দীর্ঘদিন আইয়ুব বাচ্চুর সাথে রক্ত-ঘাম ঝরিয়েছেন, তাদের কাউকেই এই প্রজেক্টে যুক্ত করা হয়নি বা মতামত নেওয়া হয়নি।

​চট্টগ্রামের শিল্পীদের উপেক্ষা:

আইয়ুব বাচ্চুর জন্মস্থান চট্টগ্রামের কোনো ব্যান্ড বা স্থানীয় সম্ভাবনাময় ও গুণী শিল্পীদের এই প্রজেক্টে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। ​অনি হাসানের মতো গিটারিস্টকে অ্যালবাম থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। দেশের অন্যতম সেরা গিটারিস্ট অনি হাসানকে এই প্রজেক্টে যুক্ত করার পর বাদ দেওয়ার তীব্র প্রতিবাদ জানান রোমেল।

ফান্ডরাইজিং-এর নামে গানের কবর রচনা:

​ফান্ডরাইজিং বা আইয়ুব বাচ্চুর মিউজিয়াম তৈরির উদ্দেশ্যে গান রিমেক করার যুক্তিকে সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য বলে মনে করেন রোমেল। তার মতে, ট্রিবিউট কনসার্ট বা বড় আকারের আয়োজন করে ফান্ড সংগ্রহ করা যেত, কিন্তু ফান্ড তোলার দোহাই দিয়ে এলআরবি’র কালজয়ী গানগুলোকে বিকৃত করার কোনো অধিকার পরিবার বা অন্য কারো নেই।

জবাবদিহিতা ও আইয়ুব বাচ্চুর মৃত্যুর রাতের প্রশ্ন:

​রোমেল এবং সংশ্লিষ্ট ব্যান্ড সংগীতাঙ্গনের ব্যক্তিরা অভিযোগ তুলছেন যে, এই সিদ্ধান্তের দায়ভার প্রজেক্টের অনুমোদনকারী ও আইয়ুব বাচ্চুর পরিবারের (বিশেষ করে তার স্ত্রী ফেরদৌস আক্তার চন্দনা ও ঘনিষ্ঠদের) ওপরই বর্তায়। ​একই সাথে মিউজিয়াম ও প্রজেক্টের নামে কারা এবং কেন মূল গানগুলোকে পরিবর্তন করার অনুমতি দিচ্ছে—তা নিয়ে চরম ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়েছে। সেই সাথে আইয়ুব বাচ্চুর শেষ জীবনের একা থাকা ও পারিবারিক দূরত্ব নিয়েও ভক্ত ও সহশিল্পীদের মধ্যে গভীর প্রশ্ন রয়ে গেছে।
​আইয়ুব বাচ্চুর অগণিত ভক্ত ও দেশের সংগীতাঙ্গন চায়, ‘এবি’ (আইয়ুব বাচ্চু) এবং ‘এলআরবি’-র মূল কাজগুলোকে স্পর্শ না করে যেভাবে আছে সেভাবেই সংরক্ষণ করা হোক। ফান্ডরাইজিং বা স্মারক উদ্যোগের নামে তার সুরের মৌলিকত্ব নষ্ট করা ব্যান্ডের সহশিল্পী ও সাধারণ শ্রোতারা কোনোভাবেই মেনে নেবেন না।

অন্যদিকে ​​আইয়ুব বাচ্চুর সৃষ্টি শুধু পরিবারের নয়, দেশ ও ভক্তদের সম্পদ বলেছেন সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ার ও ম্যানেজার শামীম আহমেদ।

প্রয়াত আইয়ুব বাচ্চুর গান নিয়ে সম্প্রতি তৈরি হওয়া বিতর্ক ও নতুন অ্যালবাম উন্মোচন প্রসঙ্গে তিনিও অকপটে মুখ খুলেছেন। তিনি জানান, প্রয়াত এই শিল্পীর গান ও সৃষ্টির ওপর শুধু তাঁর পরিবারের একক অধিকার নয়, বরং তা দেশ ও কোটি ভক্তের ভালোবাসার সম্পদ।

এক ফোনালাপে আইয়ুব বাচ্চুর স্মৃতি ও তাঁর গানের রিমেক/প্রযোজনা সংক্রান্ত নানা জটিলতা নিয়ে শামীম তাঁর মতামত তুলে ধরেন।

আইয়ুব বাচ্চুর গান পুনর্নির্মাণ ও অ্যালবামের বাণিজ্যিক উদ্যোগ নিয়ে সংগীতঙ্গ ও ভক্তদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। এ প্রসঙ্গে শামীম জানান, এই প্রজেক্টটির পরিকল্পনা ও পরিবেশনা নিয়ে নানা বিতর্ক তৈরি হওয়ায় ইতিমধ্যে তিনটি গান সরিয়ে নেওয়া হয়েছে এবং বাকি কার্যক্রম আপাতত স্থগিত রাখা হয়েছে।

শামীম অত্যন্ত দৃঢ়চিত্তে জানান, এই অ্যালবামটি সৃষ্টির পেছনে এককভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন প্রয়াত আইয়ুব বাচ্চুর স্ত্রী ফেরদৌস আক্তার চন্দনা। এতে তাঁর কোন হাত নেই এবং এই বিষয়ে তাঁকে অবহিত করা হয়নি। শামীম আরও বলেন, চন্দনা ভাবী কোন ফাঁদে পড়তে পারেন। আমরা তাঁর পাশে আছি এবং থাকবো। এখান থেকে তাঁকে বের করে আনতে হবে।

‘উত্তরাধিকার’ অ্যালবামের প্রধান প্রযোজক বা পৃষ্ঠপোষক মূলত আইয়ুব বাচ্চু ফাউন্ডেশন। তবে চিশতি ইকবাল এই বিশেষ মিউজিক প্রজেক্ট বা অ্যালবামের প্রধান সমন্বয়ক (Coordinator) হিসেবে কাজ করেছেন।

আইয়ুব বাচ্চুর স্ত্রী ফেরদৌস আক্তারের ইচ্ছায় ও এবি ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে এই প্রজেক্টটি সাজানো হয়েছে। এই অ্যালবামে আইয়ুব বাচ্চুর জনপ্রিয় ২০টি গান নতুন সংগীতায়োজনে স্থান পেয়েছে। দেশের শীর্ষস্থানীয় ৮টি ব্যান্ড এবং ১২ জন একক শিল্পী (মোট ২০টি দল/শিল্পী) এতে কণ্ঠ দিয়েছেন।

এ অ্যালবাম থেকে প্রাপ্ত অর্থ ‘আইয়ুব বাচ্চু মিউজিয়াম’ তৈরির তহবিলে জমা করা হবে। এই প্রসঙ্গে চিশতি ইকবাল ঠিক কি ধরনের চুক্তিতে আবদ্ধ হয়েছেন তা জানা যায়নি। এখন পর্যন্ত ফেরদৌস আক্তারকে কত টাকা পরিশোধ করেছেন তাও জানা সম্ভব হয়নি।
চিশতি ইকবালকে মুঠোফোনে ফোন করা হলেও সাড়া দেননি। একইভাবে ফেরদৌস আক্তারের মুঠোফোনেও সাড়া মেলেনি।

​শামীম আরও বলেন, ‘আইয়ুব বাচ্চুর গান কোনো তাড়াহুড়ো করে পুনর্নির্মাণ করা উচিত নয়। যদি কোনো কাজ করতেও হয়, তবে দেশের প্রবীণ সংগীতশিল্পী ও অভিজ্ঞ মিউজিশিয়ানদের নিয়ে একটি প্যানেল বা কমিটি গঠন করা উচিত। তারাই গানের গুণগত মান যাচাই-বাছাই করবেন এবং শ্রোতাদের মতামতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।’

​অ্যালবাম বাতিল ও বিকৃতির প্রতিবাদে ভক্তদের মানববন্ধন:

আইয়ুব বাচ্চুর কালজয়ী গানগুলো বিকৃত করে অ্যালবাম তৈরির চেষ্টা এবং পরবর্তীতে নানা বিতর্কের মুখে তা স্থগিতের ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন তাঁর ভক্ত-অনুরাগীরা। আইয়ুব বাচ্চুর সুর ও সৃষ্টির মৌলিকতা রক্ষায় এবং মানহীন রিমেক পুরোপুরি বাতিলের দাবিতে চট্টগ্রামের রূপালী গীটার চত্বরে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশের আয়োজন করছে সংগীতপ্রেমীরা। Voice of AB সংগঠনের ব্যানারে চট্টগ্রামের মিউজিশিয়ান মবিন, ইমু, সোমেন সরকার, জাহিদ খান, আসাদুর রহমান, ফাইজুস মাসুম, মঈনুদ্দিন রনি, অম্লান নন্দী, অনিক নন্দী, ইফতেখান খান ইকা (Guitar Hall school of music) সারজিল, হিমু প্রমুখ মানববন্ধনের মূল উদ্যোক্তা। এলআরবির ড্রামার গোলাম রহমান রোমেল বলেন, এলআরবির পক্ষ থেকে আমরা কেউ মানববন্ধনের উদ্যোগ নিইনি। তবে তিনি এতে উপস্থিত থেকে প্রতিবাদের দৃঢ়প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন।

মানববন্ধনের মূল বার্তা হচ্ছে আইয়ুব বাচ্চুর গানের মূল সুর বিকৃতি বন্ধ করা ও মৌলিকতা বজায় রাখা, বাণিজ্যিক স্বার্থে রক কিংবদন্তির সৃষ্টি নিয়ে ছিনিমিনি খেলা বন্ধ করা এবং বিতর্কিত অ্যালবাম স্থায়ীভাবে বাতিল ও মেধা-সত্ত্ব সুরক্ষায় নীতিমালা প্রনয়ণ।

কিংবদন্তি এই শিল্পীর গান নিয়ে কোনো ধরনের দায়িত্বজ্ঞানহীন পরীক্ষা-নিরীক্ষা মেনে নেওয়া হবে না বলে জোর দাবি তুলেছেন মানববন্ধনের আয়োজকরা।

​পরিবারের ভূমিকা ও আইনি-নৈতিক দিক:

আইয়ুব বাচ্চুর পরিবারের (আইয়ুব বাচ্চুর স্ত্রী ও দুই সন্তান) প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে শামীম উল্লেখ করেন, অ্যালবামের প্রযোজকদের বাণিজ্যিক লোভে পড়ে পরিবার হয়তো কোনো ভুল সিদ্ধান্তে পা বাড়িয়েছে। তবে মনে রাখতে হবে, আইয়ুব বাচ্চু শুধু পরিবারের সম্পত্তি নন, তিনি একটি পাওয়ার হাউস। তাঁর সুর ও গান বাংলাদেশের সংগীত ইতিহাসের মাইলফলক। তাই পরিবার চাইলেই হুট করে যার-তার হাতে এসব গানের দায়িত্ব তুলে দিতে পারে না।

রক কিংবদন্তির অবদানের মূল্যায়ন:

সর্বশেষ ​আইয়ুব বাচ্চুর স্মৃতি ও তাঁর সৃষ্টিকে সঠিকভাবে সংরক্ষণ করার জন্য এলআরবির ব্যান্ড সদস্য, সহশিল্পী এবং সংগীতপ্রেমীদের সঙ্গে সমন্বয় করে কার্যকরী পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন শামীম আহমেদ।