প্রধান বিচারপতি

ন্যায় ব্যর্থ হলে শক্তিশালী রাষ্ট্রও ভেঙে পড়ে


বাংলার মুখ ডেস্ক প্রকাশের সময় : অক্টোবর ২৫, ২০২৫, ৭:৩৩ অপরাহ্ন

আইন কেবল নিয়মের সমষ্টি নয়, এটি একটি জাতির নৈতিক বিবেকের প্রতিফলন— এমন মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদ। তিনি বলেন, ন্যায় প্রতিষ্ঠিত হলে রাষ্ট্র দৃঢ় হয়, কিন্তু ন্যায় ব্যর্থ হলে সবচেয়ে শক্তিশালী রাষ্ট্রও ভেঙে পড়ে।

শনিবার (২৫ অক্টোবর) রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের ৭২তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে কাজী নজরুল ইসলাম মিলনায়তনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

প্রধান বিচারপতি বলেন, মানবতা যখন অবিচার ও অমানবিক রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার পরিণতি দেখে হতবাক হয়, তখনই মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণা মানবজাতিকে নতুন এক নৈতিক চেতনার দিকে নিয়ে যায়। রাষ্ট্র যখন নাগরিকের মর্যাদা রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়, তখন ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানো নৈতিকভাবে অপরিহার্য হয়ে পড়ে।

তিনি বলেন, ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন ছিল ন্যায়, মর্যাদা ও অস্তিত্বের অধিকারের লড়াই; আর ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ছিল মর্যাদা, সমতা ও আত্মনিয়ন্ত্রণের সংগ্রাম।

বিচার বিভাগ সংস্কার প্রসঙ্গে ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদ জানান, দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি বিচার বিভাগ সংস্কারের একটি ‘রোডম্যাপ’ ঘোষণা করেছেন, যার মূল উদ্দেশ্য একটি পৃথক সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠা। তিনি বলেন, “সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ ২০২৫ আমাদের ১৫ মাসের পরিকল্পিত কৌশল ও যৌথ প্রয়াসের ফল।”

তিনি সতর্ক করে বলেন, কোনো ধরনের অবিশ্বাস বা একতরফা আচরণ বিচার বিভাগের প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতাকে দুর্বল করতে পারে। তাই অংশীজনদের মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বাস ও সমন্বয়ের সংস্কৃতি গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি।

নবীন আইনজীবী ও শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে প্রধান বিচারপতি বলেন, “আইন অধ্যয়ন শুধু পেশাগত প্রশিক্ষণ নয়, এটি ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার সাধনা। প্রতিটি আইনের পেছনে আছে একটি জীবন, প্রতিটি রায়ের পেছনে আছে একটি ভাগ্য।”

তিনি প্রযুক্তিনির্ভর বিচারব্যবস্থার গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, “আমরা এখনো ঔপনিবেশিক কাঠামোর উত্তরাধিকার বহন করছি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডেটা ব্যবস্থাপনা ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির সমন্বয়ে বিচারব্যবস্থাকে সময়োপযোগী করতে হবে।”

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অবদান স্মরণ করে তিনি বলেন, “এই বিশ্ববিদ্যালয় অসংখ্য প্রাজ্ঞ আইনবিদ তৈরি করেছে, যারা জ্ঞানে ও মানবিকতায় আলোকিত।”

বক্তব্যের শেষে তিনি বলেন, “ন্যায়বিচারের পুনর্জাগরণ এখন সময়ের আহ্বান। সংবিধানের স্বাধীনতা, সমতা ও ন্যায়বিচারের অঙ্গীকার যেন প্রতিটি নাগরিকের দোরগোড়ায় পৌঁছে যায়, সেটিই আমাদের দায়িত্ব।”

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. সালেহ্ হাসান নকীব। তিনি বলেন, “আইন বিভাগ মানুষের আচরণ ও সমাজকে নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ন্যায় প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখছে।” তিনি অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনকে আরও সক্রিয় ও স্বার্থহীন ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান।

অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী, বিচারপতি এস.এ.সহ অন্যান্য বিচারপতি, শিক্ষক ও সাবেক শিক্ষার্থীরা।