এম আর খান বাংলাদেশের প্রথিতযশা অধ্যাপক, চিকিৎসক ও শিশু বিশেষজ্ঞ। এম আর খান নামে তিনি সর্বাধিক পরিচিত হলেও তার পুরো নাম মোহাম্মদ রফি খান। বাবা মা, প্রতিবেশী সকলের কাছে তিনি ‘খোকা’ নামেই বেশি পরিচিত ছিলেন। তিনি বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক জাতীয় অধ্যাপক নির্বাচিত হয়েছিলেন।
এম আর খানের জন্ম ১৯২৮ সালের ১ আগস্টে সাতক্ষীরায়। বাবা আলহাজ্ব আব্দুল বারী খান ও মা জায়েরা খানম। তাঁদের চার ছেলের মধ্যে তিনি ছিলেন মেজ।
সাতক্ষীরা সদরের পিএন স্কুলে ভর্তি হন তিনি। পড়াশুনায় খুবই মেধাবী ছিলেন। ছেলেবেলায় খুব ভাল ফুটবল খেলতেন। রসুলপুর স্কুল টিম লিডার হিসেবে তিনি ১৩টি ট্রফি জিতেছিলেন।
১৯৪৩ সালে এই স্কুল থেকেই কৃতিত্বের সাথে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিক পাশ করেন। কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজে থেকে কৃতিত্বের সাথে প্রথম বিভাগে আইএসসি পাস করেন। ১৯৫২ সালে কলকাতা মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাস করার পর সাতক্ষীরায় ফিরে আসেন তিনি। এরপর ১৯৫৬ সালে উচ্চশিক্ষা লাভের জন্য লন্ডনে পাড়ি জমান এবং বৃটেনের এডিনবার্গ স্কুল অব মেডিসিনে ভর্তি হন।
সেখান থেকে একই সালে ডিপ্লোমা ইন ট্রপিক্যাল মেডিসিন অ্যান্ড হাইজিন (ডিটিএমএন্ডএইচ) ডিগ্রী লাভ করেন। স্কুল অব মেডিসিন লন্ডন থেকে তিনি ডিপ্লোমা ইন চাইল্ড হেলথ (ডিসিএইচ) ডিগ্রিও লাভ করেন।
১৯৬২ সালে ‘এডিনবার্গের রয়েল কলেজ অব ফিজিশিয়ান’ থেকে তিনি এমআরসিপি ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশ থেকে এফসিপিএস এবং ১৯৭৮ সালে এডিনবার্গ থেকে এফআরসিপি ডিগ্রি লাভ করেন।
রসুলপুর গ্রামের মেয়ে এম আর খানের দূর সম্পর্কের আত্মীয় আনোয়ারা বেগম আনুর সাথে ১৯৫৪ সালের ১ জানুয়ারি বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। আনোয়ারা বেগম ও ডা. এম আর খান দম্পতির একমাত্র মেয়ের নাম দৌলতুন্নেসা (ম্যান্ডি)।
বিদেশে পড়াশুনা শেষ করে তিনি ১৯৫৭ থেকে ১৯৬২ সাল পর্যন্ত ইংল্যান্ডের ম্যানচেস্টার কেন্ট এবং এডিনবার্গ গ্রুপ হাসপাতালে যথাক্রমে সহকারী রেজিস্টার ও রেজিস্টার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬২ সালে তিনি দেশে ফিরে আসেন।
১৯৬৩ সালে তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এসোসিয়েট প্রফেসর অব মেডিসিন পদে যোগ দেন। ১৯৬৪ সালে রাজশাহী মেডিকেল কলেজে মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক (শিশুস্বাস্থ্য) পদে যোগদান করেন।
১৯৬৯ সালে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে ঢাকা মেডিকেল কলেজের শিশু বিভাগে যোগ দেন এবং এক বছরের মধ্যেই অর্থাৎ ১৯৭০ সালে তিনি অধ্যাপক হিসাবে পদোন্নতি পান। ১৯৭১ সালে তিনি আইপিজিএমআর -এর অধ্যাপক ও ১৯৭৩ সালে এই ইনস্টিটিউটের যুগ্ম-পরিচালকের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। ১৯৭৮ সালের নভেম্বরে তিনি ঢাকা শিশু হাসপাতালে অধ্যাপক ও পরিচালকের পদে যোগদান করেন।
একই বছরে পুনরায় তিনি আইপিজিএমআর-এর শিশু বিভাগের অধ্যাপক নিযুক্ত হন এবং দক্ষতা ও সুনামের সাথে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৮ সালে অধ্যাপক ডা. এম আর খান তার সুদীর্ঘ চাকুরী জীবন থেকে অবসর গ্রহণ করেন।
ডক্টর এম আর খান পেনশনের টাকা দিয়ে মা ও শিশুদের জন্য গড়ে তোলেন ডা. এম আর খান ও আনোয়ারা ট্রাস্ট।
এ ট্রাস্ট থেকে শিশু স্বাস্থ্য ও শিক্ষায় অনুদান, হাসপাতাল ও স্কুল প্রতিষ্ঠা, মেধাবী ও গরিব শিক্ষার্থীদের বৃত্তি প্রদান এবং চিকিৎসাক্ষেত্রে ভালো অবদানের জন্য দেয়া হয় ডা. এম আর খান ও আনোয়ারা ট্রাস্ট স্বর্ণপদক। শিক্ষা, চিকিৎসা, শিশুস্বাস্থ্য সুরক্ষা, দুর্গত অসহায় মানুষের সেবাসহ সমাজকল্যাণমূলক কাজে অসামান্য অবদান রাখায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) ডা. এম আর খানকে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি ও বাংলাদেশ বিজ্ঞান একাডেমী স্বর্ণপদক দেয়। ডক্টর এম আর খান বেসামরিক রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ পুরস্কার ২০০৯ সালে একুশে পদক এবং ২০১৬ সালে স্বাধীনতা পুরস্কার লাভ করেন।
ডক্টর এম আর খান রচিত গ্রন্থ সমূহ গুলো হলো প্রাথমিক চিকিৎসা, মা ও শিশু, আপনার শিশুর জন্য জেনে নিন, শিশুকে সুস্থ রাখুন, ড্রাগ থেরাপি ইন চিলড্রেন ইত্যাদি। ডক্টর এম আর খান ৫ই নভেম্বর ২০১৬ সালে ইহকাল ত্যাগ করে পরপারে চলে যান।
বাংলাদেশের অন্যতম খ্যাতিমান শিশু বিশেষজ্ঞ ডক্টর এম আর খানের প্রয়াণ দিবসে গভীর শ্রদ্ধা এবং ভালোবাসা।”
আপনার মতামত লিখুন :