সুপার এল নিনোর ছোবলে ৬ মাসে সাড়ে ৪ লাখ মৃত্যুর আশঙ্কা


আন্তর্জাতিক ডেস্ক প্রকাশের সময় : সেপ্টেম্বর ২৩, ২০২৬, ৯:০৪ অপরাহ্ন

বিশ্বজুড়ে ভয়াবহ তাপপ্রবাহের আশঙ্কা তৈরি করছে শক্তিশালী ‘সুপার এল নিনো’। নতুন এক গবেষণার পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি বছরের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অতিরিক্ত তাপের কারণে বিশ্বে প্রায় ৪ লাখ ৫১ হাজার মানুষের মৃত্যু হতে পারে। এর বাইরে এল নিনোর প্রভাবে খরা, দাবানল ও বন্যার মতো চরম আবহাওয়াজনিত দুর্যোগেও প্রাণহানির আশঙ্কা রয়েছে।

বুধবার প্রকাশিত ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান-এর এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। পূর্বাভাসটি তৈরি করেছে ইউনিভার্সিটি অব শিকাগোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট ল্যাবের গবেষকেরা। তাদের হিসাবে, আগামী ছয় মাসে অতিরিক্ত তাপজনিত মৃত্যুর সংখ্যা ৪ লাখ ৫১ হাজারের বেশি হতে পারে। তবে উচ্চ তাপমাত্রাজনিত মৃত্যুর ঝুঁকি ২০২৭ সালের জুন বা জুলাই পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে।

গবেষকদের পূর্বাভাসে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানির আশঙ্কা করা হয়েছে নাইজেরিয়া, ইন্দোনেশিয়া, সুদান, ভারত ও ব্রাজিলে। যুক্তরাষ্ট্রও সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর তালিকায় রয়েছে; সেখানে অতিরিক্ত প্রায় ৩ হাজার ৫০০ তাপজনিত মৃত্যুর আশঙ্কা করা হয়েছে। আফ্রিকার সাহেল অঞ্চল ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াতেও তাপপ্রবাহের প্রভাব ব্যাপক হতে পারে।

গবেষণায় বিশ্বের ২৪ হাজার ৩৭৮টি অঞ্চলে তাপমাত্রা ও অতিরিক্ত তাপজনিত মৃত্যুর মাসভিত্তিক সম্পর্ক বিশ্লেষণ করা হয়েছে। ১৯৯৬ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত গড় মাসিক তাপজনিত মৃত্যুর হারকে ভিত্তি ধরে আগামী কয়েক মাসে এল নিনোর কারণে সম্ভাব্য তাপমাত্রা বৃদ্ধির পূর্বাভাসের সঙ্গে তা মিলিয়ে মৃত্যুর হিসাব করা হয়েছে। গবেষকেরা স্পষ্ট করেছেন, এটি ভবিষ্যৎ মৃত্যুর একটি মডেলভিত্তিক পূর্বাভাস, ইতোমধ্যে ঘটে যাওয়া মৃত্যুর হিসাব নয়।

ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট ল্যাবের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও ইউনিভার্সিটি অব শিকাগোর অধ্যাপক মাইকেল গ্রিনস্টোন বলেন, ৪ লাখ ৫১ হাজার মানুষের সম্ভাব্য মৃত্যুর হিসাবটি বিশাল হলেও এর পেছনে রয়েছে সাধারণ মানুষের জীবন—পরিবারের সদস্য, প্রতিবেশী ও কর্মজীবী মানুষ। তাঁর মতে, ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলগুলো চিহ্নিত করে আগাম ব্যবস্থা নেওয়া গেলে বহু প্রাণ রক্ষা করা সম্ভব।

গবেষকেরা তাপজনিত মৃত্যু কমাতে আগাম তাপমাত্রার পূর্বাভাস, শীতল আশ্রয়কেন্দ্র স্থাপন, তীব্র গরমের সময় হাসপাতাল ও চিকিৎসাকেন্দ্রে অতিরিক্ত জনবল নিয়োগ এবং বাইরে কাজ করা শ্রমিকদের সুরক্ষার মতো পদক্ষেপের পরামর্শ দিয়েছেন। বিশেষ করে যেসব অঞ্চলে তাপপ্রবাহের ঝুঁকি বেশি, সেখানে দ্রুত জরুরি ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

এদিকে বর্তমান এল নিনো ইতোমধ্যে নজিরবিহীন তাপমাত্রার রেকর্ড ছুঁয়েছে। গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সোমবার এই এল নিনো এ ঘটনার আগের সর্বোচ্চ রেকর্ড করা তাপমাত্রার সীমা ছাড়িয়ে গেছে—যখন এর চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছানোর এখনও কয়েক মাস বাকি। অস্বাভাবিক শক্তিশালী এই পরিস্থিতিকে বিজ্ঞানীরা ‘গডজিলা-স্তরের’ এল নিনো হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

এল নিনো একটি প্রাকৃতিক জলবায়ু প্রক্রিয়া হলেও বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে এর প্রভাব আরও তীব্র হতে পারে বলে বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা। সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, উষ্ণতর বৈশ্বিক জলবায়ুর ওপর এই এল নিনোর প্রভাব পড়ায় বিভিন্ন অঞ্চলে তীব্র তাপ, খরা, দাবানল ও বন্যার ঝুঁকি বাড়ছে।

তাপপ্রবাহের পাশাপাশি খাদ্যনিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। আগস্টে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (WFP) সতর্ক করেছিল, এল নিনোর প্রভাবে প্রায় ৫ কোটি মানুষ তীব্র খাদ্যসংকটে পড়তে পারেন এবং খাদ্যের দামও বাড়তে পারে। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কৃষি উৎপাদন ও পানির ওপরও এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডনের অধ্যাপক ফ্রিডেরিকে অটো বলেন, বর্তমান এল নিনো এমন একটি উষ্ণ জলবায়ু ব্যবস্থার ওপর আঘাত হানছে, যা ইতোমধ্যে মানব কর্মকাণ্ডের কারণে উষ্ণ হয়ে উঠেছে। ফলে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে নজিরবিহীন তাপমাত্রা দেখা দিতে পারে, যার প্রভাব পড়বে মানুষের স্বাস্থ্য, খাদ্যনিরাপত্তা ও পানির ওপর।

গবেষকদের মতে, এবারের এল নিনো আগামী কয়েক দশকে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে যে ধরনের তাপমাত্রা স্বাভাবিক হয়ে উঠতে পারে, তার একটি সতর্কসংকেত। তাই আগামী কয়েক মাসের ঝুঁকি মোকাবিলায় জরুরি প্রস্তুতির পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে তাপপ্রবাহ মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে।