সিগন্যাল ভাঙলেই ডিজিটাল কেস: তিন দিনে এআই ক্যামেরায় আড়াই হাজার ফুটেজ


বাংলার মুখ প্রতিবেদক প্রকাশের সময় : মে ১২, ২০২৬, ১২:৪৮ অপরাহ্ন

ঢাকার ব্যস্ত সড়কগুলোতে ট্রাফিক আইন ভাঙার পুরোনো অভ্যাসে ধীরে ধীরে পরিবর্তন আসছে। এখন আর মোড়ে ট্রাফিক পুলিশ না থাকলেই সিগন্যাল অমান্য করে পার পাওয়া যাচ্ছে না।
রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে বসানো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) চালিত ক্যামেরা স্বয়ংক্রিয়ভাবে শনাক্ত করছে আইন ভঙ্গের ঘটনা—আর সেই ফুটেজের ভিত্তিতেই দেওয়া হচ্ছে ডিজিটাল মামলা।

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ট্রাফিক বিভাগ জানিয়েছে, রাজধানীর সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে পরীক্ষামূলকভাবে চালু করা এই প্রযুক্তি প্রথম তিন দিনেই আড়াই হাজারের বেশি ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের ফুটেজ সংগ্রহ করেছে।

ডিএমপির তথ্য অনুযায়ী, গত ৭ মে থেকে রাজধানীর অন্তত ২৫টি গুরুত্বপূর্ণ ট্রাফিক পয়েন্টে এআই-ভিত্তিক সিসিটিভি ক্যামেরা চালু করা হয়। রোববার পর্যন্ত সংগৃহীত ভিডিও ফুটেজ এখন যাচাই করছে ট্রাফিক পুলিশের টেকনিক্যাল টিম (টিটিইউ)। যাচাই শেষে সংশ্লিষ্ট গাড়ির মালিক ও চালকদের বিরুদ্ধে ডিজিটাল মামলা ও নোটিশ পাঠানো হবে।

প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এই প্রযুক্তি শুধু আইন প্রয়োগ নয়, বরং সড়কে আচরণগত পরিবর্তন আনতেও ভূমিকা রাখছে। চালকেরা এখন আগের তুলনায় বেশি সতর্ক হচ্ছেন—বিশেষ করে মোটরসাইকেল আরোহীদের মধ্যে এর প্রভাব দৃশ্যমান।

রাজধানীর শাহবাগ, বাংলামোটর, কারওয়ান বাজার, বিজয় সরণি, কাকরাইল, মৎস্য ভবন, হাইকোর্ট ক্রসিং, গাবতলী, রামপুরা ও শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ সরণিসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে এই ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে।

এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে ক্যামেরাগুলো লাল বাতি অমান্য, স্টপ লাইন ভঙ্গ, উল্টো পথে চলাচল, জেব্রা ক্রসিং দখল, হেলমেট ছাড়া মোটরসাইকেল চালানো, সিটবেল্ট না পরা, গাড়ি চালানোর সময় মোবাইল ফোন ব্যবহার, অবৈধ পার্কিং এবং অনুমতি ছাড়া ভিআইপি লাইট ব্যবহারের মতো অপরাধ শনাক্ত করছে।

সোমবার সকালে কারওয়ান বাজার মোড়ে সরেজমিনে দেখা যায়, যানবাহনের চাপ স্বাভাবিক থাকলেও সিগন্যাল পরিবর্তনের সময় চালকদের আচরণে বাড়তি সতর্কতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। অনেক চালক সিগন্যাল ভাঙার আগে কয়েকবার চারপাশে তাকাচ্ছেন, আবার কেউ কেউ স্টপ লাইনের আগেই থেমে যাচ্ছেন।

দায়িত্বরত ট্রাফিক সদস্যরা জানান, ক্যামেরা বসানোর পর অনেক চালকই এখন বুঝতে পারছেন যে ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের ঘটনা তাৎক্ষণিকভাবে রেকর্ড হচ্ছে। ফলে পুলিশের উপস্থিতি ছাড়াই এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক নিয়ন্ত্রণ তৈরি হয়েছে।

কারওয়ান বাজার মোড়ে দায়িত্ব পালনকারী ডিএমপির ট্রাফিক ইন্সপেক্টর মো. সবদুল বলেন, আগে আইন ভঙ্গকারী গাড়ি থামিয়ে ব্যবস্থা নিতে গেলে সড়কে জটলা তৈরি হতো। কাগজপত্র যাচাই ও মামলা প্রক্রিয়ায় দীর্ঘ সময় লেগে যেত। এখন ক্যামেরার মাধ্যমে প্রমাণ সংগ্রহ হওয়ায় ট্রাফিক সদস্যরা যান চলাচল নিয়ন্ত্রণে বেশি মনোযোগ দিতে পারছেন।

ট্রাফিক বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, প্রযুক্তিনির্ভর এই ব্যবস্থার ফলে সরাসরি পুলিশি হস্তক্ষেপ কমবে, আইন প্রয়োগে স্বচ্ছতা বাড়বে এবং প্রমাণভিত্তিক মামলা নিশ্চিত করা সহজ হবে। তবে পুরো ব্যবস্থাটি কার্যকর করতে প্রযুক্তিগত দক্ষতা, পর্যাপ্ত জনবল এবং নাগরিক সচেতনতা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু নজরদারি প্রযুক্তি চালু করলেই দীর্ঘমেয়াদে সড়ক শৃঙ্খলা নিশ্চিত হবে না। এর পাশাপাশি চালকদের মধ্যে আইন মানার সংস্কৃতি গড়ে তোলা এবং ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাও জরুরি।

ঢাকার সড়কে বাড়তে থাকা যানজট ও অনিয়ম নিয়ন্ত্রণে এআই প্রযুক্তির এই ব্যবহার কতটা কার্যকর হয়, এখন সেটিই দেখার বিষয়।