বিএটির বিরুদ্ধে বড় ধরনের দুর্নীতি ও মানিলন্ডারিং অভিযোগ: অনুসন্ধানে দুদক


বাংলার মুখ প্রতিবেদক প্রকাশের সময় : মে ২৫, ২০২৬, ১:২৬ পূর্বাহ্ন

​স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রীয় মালিকানায় যাওয়ার কথা থাকলেও জাল জালিয়াতি ও রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে ঢাকা ও চট্টগ্রামের দুটি কারখানার মালিকানা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখার অভিযোগে ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশ (বিএটিবি)-এর বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। একই সাথে গত ৫৫ বছরে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে প্রায় ২০ থেকে ৩০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় যা আড়াই লাখ কোটি টাকারও বেশি) বিদেশে পাচারের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
​গতকাল শনিবার (২৩ মে) দুদকের উপ-পরিচালক আক্তারুল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, প্রাপ্ত সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে প্রাথমিক অনুসন্ধান শুরু হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় নথিপত্র তলব করা হয়েছে।

​পরিত্যক্ত সম্পত্তি আত্মসাৎ ও জালয়াতি:
​দুদকে জমা দেওয়া অভিযোগপত্র থেকে জানা যায়, পাকিস্তান টোব্যাকো কোম্পানি ১৯৪৭ সালে করাচিতে প্রথম কারখানা স্থাপনের পর ১৯৪৯ সালে চট্টগ্রাম এবং ১৯৬৫ সালে ঢাকায় দুটি কারখানা গড়ে তোলে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর তৎকালীন আইন অনুযায়ী এই দুই কারখানা পরিত্যক্ত সম্পত্তি হিসেবে বাংলাদেশ সরকারের মালিকানায় যাওয়ার কথা ছিল।
​এমনকি ১৯৭২ থেকে ১৯৭৪ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে পাকিস্তান টোব্যাকো কোম্পানি বাংলাদেশে তাদের এই দুটি কারখানা হারানোর বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করে এবং এর বিপরীতে পাকিস্তান সরকারের কাছ থেকে বড় অঙ্কের কর ছাড় ও ক্ষতিপূরণও সুবিধা নেয়।
​তবে পরবর্তীতে তৎকালীন পাকিস্তান টোব্যাকো কোম্পানির এক অর্থ ব্যবস্থাপক বাংলাদেশের কয়েকজন প্রভাবশালী মন্ত্রী, ব্যবসায়ী ও সরকারি কর্মকর্তার সহায়তায় ভুয়া ও জাল কাগজপত্র তৈরি করেন। রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক চাপ প্রয়োগ করে যৌথমূলধন কোম্পানি ও ফার্মসমূহের পরিদপ্তরকে (আরজেএসসি) বাধ্য করে কোম্পানিটিকে বাংলাদেশে নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখানো হয়। এর মাধ্যমে ঢাকা ও চট্টগ্রামের মূল্যবান কারখানাসহ পুরো মালিকানা কাঠামো ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকোর নিয়ন্ত্রণে বহাল রাখা হয়।

​২৫ থেকে ৩০ বিলিয়ন ডলার পাচারের অভিযোগ:
​অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, অবৈধভাবে মালিকানা ধরে রেখে গত ৫৫ বছরে প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশ থেকে প্রায় ২০ থেকে ৩০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বৈদেশিক মুদ্রা হিসেবে বিদেশে পাচার করেছে। আইন অনুযায়ী এই বিপুল পরিমাণ অর্থ ও কারখানার লভ্যাংশ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা হওয়ার কথা ছিল। ঘটনাটিকে বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম বড় আর্থিক কেলেঙ্কারি ও অর্থ পাচার হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে অভিযোগপত্রে।

​আরজেএসসির নথি তলব, আন্তর্জাতিক সহায়তার উদ্যোগ:
​অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে দুদক বাংলাদেশ টোব্যাকো কোম্পানি লিমিটেড, পাকিস্তান টোব্যাকো কোম্পানি লিমিটেড এবং ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশ কোম্পানির নিবন্ধনসংক্রান্ত সব নথি তলব করেছে।

এসব নথির মধ্যে রয়েছে:
​মেমোরেন্ডাম ও আর্টিকেল অব অ্যাসোসিয়েশন,
​মূল মালিকানা কাঠামো ও নিবন্ধিত কার্যালয়ের তথ্য,
​কারখানার তালিকা ও ইনকরপোরেশন সনদ,
​অনুমোদিত ও পরিশোধিত মূলধন, শেয়ারের সংখ্যা এবং পরিচালনা পর্ষদসংক্রান্ত তথ্যাদি।
​আগামী ১৫ জুনের মধ্যে যৌথমূলধন কোম্পানি ও ফার্মসমূহের পরিদপ্তরকে (আরজেএসসি) এসব সত্যায়িত নথিপত্র দুদকের অনুসন্ধান কর্মকর্তার কাছে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
​এছাড়া অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে করাচিভিত্তিক পাকিস্তান টোব্যাকো কোম্পানির ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন সংগ্রহের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এজন্য ইসলামাবাদে বাংলাদেশ দূতাবাস এবং করাচিতে বাংলাদেশ কনস্যুলেটের মাধ্যমে কূটনৈতিক সহায়তা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।

​প্রভাব খাটিয়ে কর ফাঁকি ও আড়ালের চেষ্টা:
​অভিযোগে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, দীর্ঘ তিন দশক ধরে কর ও মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) ফাঁকির মতো বিষয়গুলো আড়াল করতে সুকৌশলে সরকারের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ও সচিবদের কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদে অন্তর্ভুক্ত বা মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে লাভজনক এজেন্সি ব্যবসার সুযোগ দিয়ে মুখ বন্ধ রাখার অভিযোগটিও এখন দুদকের তদন্তের আওতায় আনা হয়েছে।

​বিএটির বক্তব্য:
​এই বৃহৎ দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশ (বিএটিবি) জানিয়েছে, তারা পুরো বিষয়টি খতিয়ে দেখছে এবং খুব শীঘ্রই আনুষ্ঠানিক বিবৃতির মাধ্যমে কোম্পানির অবস্থান পরিষ্কার করবে।