পবিত্র ঈদুল আজহার সরকারি ছুটির শেষ দিনেও রাজধানীর শিশু হাসপাতালের চিত্র ছিল উৎসবের আনন্দের সম্পূর্ণ বিপরীত। হাসপাতালের প্রধান ফটক থেকে শুরু করে ওয়ার্ডের করিডোর—সবখানেই দেখা গেছে উদ্বিগ্ন অভিভাবকদের অপেক্ষা, চিকিৎসাকর্মীদের ব্যস্ততা এবং অসুস্থ শিশুদের ঘিরে উৎকণ্ঠার এক মানবিক বাস্তবতা।
দেশজুড়ে হামের প্রাদুর্ভাবের মধ্যে রাজধানীর শিশু হাসপাতাল এখন অনেক পরিবারের শেষ আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়েছে। ঈদের ছুটির মধ্যেও দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে অসুস্থ শিশুদের নিয়ে হাসপাতালে ছুটে আসছেন অভিভাবকরা।

শনিবার সকাল ১০টার দিকে হাসপাতাল প্রাঙ্গণে দেখা যায়, গাছতলায় মাদুর পেতে বিশ্রাম নিচ্ছেন অনেকে। কেউ রাত কাটিয়েছেন খোলা আকাশের নিচে, কেউ করিডোরে। অধিকাংশের মুখে ক্লান্তি, চোখে উদ্বেগ।
ঢাকার আদাবর এলাকার বাসিন্দা আব্দুল করিমের গল্প যেন সেই উদ্বেগেরই প্রতিচ্ছবি। ঈদ উপলক্ষে পরিবারের সঙ্গে গ্রামের বাড়ি যাওয়ার সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছিলেন তিনি। কিন্তু ছোট মেয়ের অসুস্থতা বদলে দিয়েছে সব পরিকল্পনা।
আব্দুল করিম জানান, ২৬ মে তাঁর সাত বছর বয়সী কন্যার জ্বর, বমি ও ডায়রিয়ার উপসর্গ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শে হাসপাতালে নিয়ে আসেন। পরে চিকিৎসকেরা হামের সম্ভাবনা দেখে শিশুটিকে ভর্তি করেন।
“বাচ্চার সুস্থতার চেয়ে বড় কিছু নেই,” বলেন তিনি। “ঈদের জন্য বেতন আর বোনাস মিলিয়ে যে টাকা পেয়েছিলাম, তার বেশিরভাগই চিকিৎসা ও হাসপাতালে থাকার খরচে চলে গেছে। কয়েকদিন ধরে ঠিকমতো ঘুম হয়নি। ঈদের আনন্দ বলে কিছু আর নেই।”
তিনি জানান, বড় মেয়েকে আত্মীয়দের সঙ্গে গ্রামের বাড়িতে পাঠাতে হয়েছে, আর তিনি ও তাঁর স্ত্রী হাসপাতালে থেকে ছোট মেয়ের চিকিৎসার দেখভাল করছেন।
হাসপাতালের করিডোরে আরেক লড়াই
হাসপাতালের ভেতরে দেখা মেলে আরেক মায়ের। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটির বয়স আনুমানিক আট থেকে দশ বছর। শিশুটির গলায় জটিল রোগের চিকিৎসা চলছে।
মা জানান, এক বছর আগে শিশুটির গলায় সমস্যা ধরা পড়ে। পরবর্তী পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর জটিল রোগ শনাক্ত হয়। চিকিৎসকদের পরামর্শে পুনরায় হাসপাতালে ভর্তি করাতে এসেছেন তারা।
এ ধরনের অসংখ্য পরিবার ঈদের আনন্দকে পেছনে ফেলে হাসপাতালের বিছানা, করিডোর ও অপেক্ষাকক্ষে সময় কাটাচ্ছে। কারও সন্তানের হাম, কারও ক্যানসার, আবার কেউ অন্য জটিল রোগের চিকিৎসার জন্য এখানে অবস্থান করছেন।
বাড়ছে রোগীর চাপ
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে হাম আক্রান্ত বা হামের উপসর্গ নিয়ে শতাধিক শিশু চিকিৎসাধীন রয়েছে। চলতি বছরের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিশু হামজনিত জটিলতা নিয়ে ভর্তি হয়েছে।
হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. আজহারুল ইসলাম বলেন, ছুটির মধ্যেও চিকিৎসাসেবা স্বাভাবিক রাখতে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
“আজ রোগীর চাপ কিছুটা বেশি। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে হাম আক্রান্ত শিশুদের এখানে পাঠানো হচ্ছে। চিকিৎসক, অধ্যাপক এবং প্রশাসনের কর্মকর্তারা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করছেন। সীমিত সক্ষমতার মধ্যেও আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি,” বলেন তিনি।
জাতীয় পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, মার্চের মাঝামাঝি সময় থেকে মে মাসের শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত দেশে নিশ্চিত হাম এবং হাম-সন্দেহভাজন রোগে মৃত্যুর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। একই সময়ে আক্রান্তের সংখ্যাও কয়েক হাজার ছাড়িয়েছে।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, আক্রান্ত ও মৃত্যুর সবচেয়ে বড় চাপ পড়েছে ঢাকা বিভাগে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিকাদান কর্মসূচির আওতা বাড়ানো, দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ এবং সচেতনতা বৃদ্ধি ছাড়া পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ কঠিন হতে পারে।
ঈদের আনন্দের আড়ালে এক নীরব সংকট
ঈদ সাধারণত পরিবার, আনন্দ ও মিলনের উৎসব। কিন্তু রাজধানীর শিশু হাসপাতালের করিডোরে দাঁড়িয়ে সেই উৎসবের আরেকটি মুখ দেখা যায়—যেখানে বাবা-মায়ের একমাত্র প্রার্থনা সন্তানের সুস্থতা।
হাসপাতালের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ছুটে চলা অভিভাবকদের চোখে ঈদের আনন্দের চেয়ে বেশি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে অনিশ্চয়তা, ক্লান্তি এবং আশার শেষ আলো ধরে রাখার সংগ্রাম।
হামের বিস্তার রোধে জাতীয় পর্যায়ে কার্যকর উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা যতটা আলোচিত হচ্ছে, ততটাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে এসব পরিবারের মানবিক বাস্তবতা—যাদের কাছে এবারের ঈদ উৎসব নয়, সন্তানের জীবন রক্ষার লড়াইয়ের আরেকটি দিন।
আপনার মতামত লিখুন :