কেয়া কসমেটিকসের ৮.৫ হাজার কোটি টাকার হিসাব উধাও: অনুসন্ধানে মাঠে ৪ সংস্থা


​বিশেষ প্রতিনিধি প্রকাশের সময় : জুলাই ২৮, ২০২৬, ৯:২৪ অপরাহ্ন

ঢাকা, ২৮ জুলাই ২০২৬ ​রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮ হাজার ৫০০ কোটি টাকা (৬৬ কোটি মার্কিন ডলার) দেশে এলেও তা বৈদেশিক মুদ্রা বা ফরেন কারেন্সি (এফসি) অ্যাকাউন্টে জমা হয়নি।

উল্টো একই লেনদেনের বিপরীতে তৈরি করা হয়েছে ‘ফোর্সড লোন’ (গ্রাহকের অসম্মতিতে ঋণ)। শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠান কেয়া কসমেটিকস লিমিটেডের প্রায় দুই দশকের লেনদেন ঘিরে ঘটে যাওয়া এই নজিরবিহীন আর্থিক অনিয়ম ও জালিয়াতি উদ্ঘাটনে যৌথভাবে অনুসন্ধানে নেমেছে চার শীর্ষ নিয়ন্ত্রক সংস্থাসমূহ।
​অর্থসূত্রের তথ্য অনুযায়ী— বাংলাদেশ ব্যাংক, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিল (এফআরসি) এবং বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) একযোগে ঘটনাটি তদন্ত করছে। আর্থিক খাত বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ঘটনাটি দেশের রপ্তানি আয় ব্যবস্থাপনা, ব্যাংকিং হিসাব, বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ এবং আর্থিক প্রতিবেদনের নির্ভরযোগ্যতাকে একসঙ্গে চরম প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।

​চার ব্যাংকের ভূমিকা ও অভিযোগ:
​কেয়া গ্রুপ চার শতাধিক ব্যাক-টু-ব্যাক এলসির মাধ্যমে রপ্তানি করলেও সংশ্লিষ্ট চার ব্যাংকের বিরুদ্ধে অর্থ জমা না করার অভিযোগ উঠেছে। ৪টি ব্যাংকের মাধ্যমে উধাও হওয়া অর্থের বিস্তারিত:
​সাউথইস্ট ব্যাংক: ৩৯.৪৬ কোটি মার্কিন ডলার
​পূবালী ব্যাংক: ২০.১৯ কোটি মার্কিন ডলার
​ন্যাশনাল ব্যাংক: ৫.৮৫ কোটি মার্কিন ডলার
​স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক: ৬৫ লাখ মার্কিন ডলার
​সবচেয়ে অবাক করার বিষয় হলো, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ড্যাশবোর্ডে এই পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা দেশে আসার তথ্য রয়েছে এবং চার ব্যাংকই কেয়া কসমেটিকসকে ‘প্রসিড রিলাইজেশন সার্টিফিকেট’ (পিআরসি) প্রদান করেছে। অথচ গ্রাহকের এফসি অ্যাকাউন্টে টাকা জমা না দেখিয়ে তৈরি করা হয়েছে ফোর্সড লোন, যা পরবর্তীতে দীর্ঘমেয়াদি ‘টার্ম লোনে’ রূপান্তর করা হয়। কেয়া গ্রুপের দাবি, ব্যাংকগুলোর এই অনিয়মের কারণে তাদের প্রায় ২,৭০০ কোটি টাকার ঋণখেলাপি বানিয়ে সচল ব্যবসা ও আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
​ব্যাংকগুলোর অবস্থান জানতে চাইলে সাউথইস্ট ব্যাংক অভিযোগ অস্বীকার করে বিএসইসির অডিট রিপোর্টের জন্য অপেক্ষা করছে বলে জানায়। স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক এটিকে ‘ভুল তথ্য’ দাবি করেছে এবং পূবালী ও ন্যাশনাল ব্যাংক কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।

​‘বেআইনি ডাবল ডেবিটিং’:
কেয়া গ্রুপের দাবি ​কেয়া গ্রুপের চেয়ারম্যান আব্দুল খালেক পাঠান সাউথইস্ট ব্যাংকের উদাহরণ টেনে বলেন, “আমার ১,০০০ মিলিয়ন ডলারের এক্সপোর্ট রিয়ালাইজ হয়েছে। ব্যাংক এর মধ্যে ৪০০ মিলিয়ন ডলারের ডকুমেন্টস (এফডিবিপি) পারচেজ দেখিয়ে আগেই নস্ট্রো অ্যাকাউন্ট থেকে কেটে রেখেছে। নিয়ম অনুযায়ী অবশিষ্ট ৬০০ মিলিয়ন ডলার আমার এফসি অ্যাকাউন্টে পাওয়ার কথা থাকলেও ব্যাংক অদ্ভুতভাবে সেখান থেকে পুনরায় ৪০০ মিলিয়ন ডেবিট করেছে। এই বেআইনি ‘ডাবল ডেবিটিং’ ও জোরপূর্বক ফোর্সড লোন চাপিয়ে দেওয়ার কারণে আমাদের আমদানির পেমেন্ট আটকে গিয়ে পুরো ব্যবসা ধ্বংসের মুখে পড়েছে।”
​তিনি আরও অভিযোগ করেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ‘গাইডলাইন ফর ফরেন এক্সচেঞ্জ ট্রানজেকশন-২০০৯’ না মানায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক, এনবিআর এবং ব্যাংকের হিসাবে চরম অমিল তৈরি হয়েছে, যা জাতীয় রিজার্ভের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

​তিন প্রশ্নে দুদকের অনুসন্ধান ও এফআরসির অবস্থান ​দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) মূলত তিনটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে:
১. রপ্তানি আয়ের অর্থ আদৌ যথাযথভাবে দেশে এসেছে কি না।
২. কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ড্যাশবোর্ডে এলসি আদায় বা ‘রিয়ালাইজড’ দেখানোর পরও কেন ফোর্সড লোন বহাল রইল।
৩. পুরো প্রক্রিয়ায় মানি লন্ডারিং বা ব্যাংকিং জালিয়াতি হয়েছে কি না।
​ইতোমধ্যে দুদক কেয়া কসমেটিকসের চেয়ারম্যানকে জিজ্ঞাসাবাদের পাশাপাশি সাউথইস্ট ব্যাংক এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের ফরেন এক্সচেঞ্জ অপারেশন বিভাগের কাছে নথি ও ব্যাখ্যা চেয়ে চিঠি দিয়েছে।
​অন্যদিকে, এফআরসি দেখতে পায় যে একই লেনদেনকে কেন্দ্র করে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ড্যাশবোর্ড, সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের লোনের রেকর্ড এবং কোম্পানির ফাইনান্সিয়াল স্টেটমেন্টের মধ্যে বিশাল অসঙ্গতি রয়েছে। এফআরসির চেয়ারম্যান ড. মো. সাজ্জাদ হোসেন জানিয়েছেন, নিরপেক্ষ অনুসন্ধানের জন্য নথিপত্র বিশ্লেষণ করে বাংলাদেশ ব্যাংক ও বিএসইসিকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বিএসইসির তালিকাভুক্ত অডিট ফার্ম ‘পিকেএফ আজিজ হালিম কবির চৌধুরী চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস’ বর্তমানে বিশেষ নিরিক্ষা ও পর্যালোচনা কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
​

দায় এড়ানোর সুযোগ নেই:

বাংলাদেশ ব্যাংক ​বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান এ বিষয়ে কড়া বার্তা দিয়ে জানিয়েছেন, ডলার দেশে না আসা কিংবা সিস্টেমে অনিয়ম করা বড় ধরনের অপরাধ। ২০ বছর আগের ঘটনা হলেও ব্যাংকিং আইন অনুযায়ী দোষীদের শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে। তদন্ত সম্পূর্ণ করার জন্য দুদক ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে অতিরিক্ত সময় চাওয়া হয়েছে বলে তিনি নিশ্চিত করেন।