জাতিসংঘ সদর দফতরে মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশের রোহিঙ্গা ও অন্যান্য সংখ্যালঘুদের দুরবস্থাকে কেন্দ্র করে অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সাতটি প্রস্তাব পেশ করা হয়েছে। সম্মেলনে অংশ নেন প্রায় ৭৫টি দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধি; প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস বাংলাদেশ প্রতিনিধি প্যানেল থেকে প্রস্তাবগুলো উপস্থাপন করেন।
ড. ইউনূস বলেন, আট বছরেও রোহিঙ্গাদের দুর্দশা অব্যাহত রয়েছে এবং আন্তর্জাতিক তহবিলে চরম ঘাটতি দেখা দিচ্ছে। তিনি সমস্যার উৎপত্তি মিয়ানমারে হওয়ায় তার সমাধানও মূলত ওই দেশে খুঁজতে হবে বলেও জোর দিয়ে বলেন। মিয়ানমার ও আরাকান সেনাবাহিনীর উপর কার্যকর আন্তর্জাতিক চাপ প্রয়োগ করে রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন বন্ধ ও তাদের দ্রুত নিরাপদ প্রত্যাবাসন শুরু করাতে হবে — এটাই বাংলাদেশের মূল দাবি।
তিনি আরও সতর্ক করেছেন যে, তহবিল হ্রাসের সঙ্গে সঙ্গে শান্তিপূর্ণ প্রত্যাবাসনই একমাত্র টেকসই বিকল্প এবং রোহিঙ্গাদের দেশে ফেরাতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দ্রুত ও কার্যকর উদ্যোগ অপরিহার্য। বাংলাদেশ উল্লেখ করেছেন যে, শরণার্থীদের কারণে দেশটি বিরাট আর্থিক, সামাজিক ও পরিবেশগত বোঝা বহন করছে এবং সীমান্তপারের অপরাধমূলক কার্যকলাপে সামাজিক নিরাপত্তা ঝুঁকির সম্মুখীন।
সম্মেলনে অংশ নেওয়া দেশ ও কর্তৃপক্ষদের কাছে ড. ইউনূস আহ্বান জানিয়েছেন—মিয়ানমারকে বাধ্য করতে হবে যেন সে রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসন কার্যক্রম ত্বরান্বিত করে, এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্থায়ী, সমন্বিত ও তহবিলসমৃদ্ধ পরিকল্পনার মাধ্যমে এই দীর্ঘদিনের সংকটের চিরস্থায়ী সমাধান করা সম্ভব হবে।
বাংলাদেশের ৭ প্রস্তাব
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, সঙ্কটের টেকসই সমাধানের জন্য, আমি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলির প্রস্তাব করছি:
প্রথমত, রাখাইনের যুক্তিসঙ্গত স্থিতিশীলতার মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের জন্য একটি বাস্তব রোডম্যাপ তৈরি করুন;
দ্বিতীয়ত, রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সহিংসতা বন্ধ করতে এবং তাদের টেকসই প্রত্যাবাসন শুরু করতে মিয়ানমার এবং আরাকান সেনাবাহিনীর উপর কার্যকর চাপ প্রয়োগ করুন, যারা সম্প্রতি বাংলাদেশে এসেছেন এবং যারা অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন তাদের দিয়ে শুরু করুন;
তৃতীয়ত, রাখাইনকে স্থিতিশীল করার জন্য আন্তর্জাতিক সমর্থন সংগ্রহ করুন এবং স্থিতিশীলতা পর্যবেক্ষণের জন্য আন্তর্জাতিক বেসামরিক উপস্থিতি স্থাপন করুন;
চতুর্থত, রাখাইন সমাজ এবং শাসনব্যবস্থায় রোহিঙ্গাদের টেকসই একীকরণের জন্য আস্থা তৈরির ব্যবস্থাগুলিকে সমর্থন করুন;
পঞ্চম, যৌথ প্রতিক্রিয়া পরিকল্পনার সম্পূর্ণ অর্থায়নের জন্য দাতাদের অবদান একত্রিত করুন;
ষষ্ঠত, জবাবদিহিতা এবং পুনরুদ্ধারমূলক ন্যায়বিচার অনুসরণ করুন; এবং
সপ্তমত, মাদক-অর্থনীতি ভেঙে ফেলুন এবং আন্তঃসীমান্ত অপরাধের বিরুদ্ধে লড়াই করুন।
তিনি বলেন, বিশ্ব রোহিঙ্গাদের আর বাড়ি ফিরে যাওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে পারে না। আজ, আসুন আমরা এই সংকট চিরতরে সমাধানের জন্য একসাথে কাজ করার অঙ্গীকার করি। বাংলাদেশ এই লক্ষ্যে পূর্ণ সহযোগিতা প্রদানের জন্য প্রস্তুত।
আপনার মতামত লিখুন :