বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে ফের জেগে উঠেছে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ঘিরে উত্তপ্ত বিতর্ক। সেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতেই আজ মঙ্গলবার (২১ অক্টোবর) দেশের সর্বোচ্চ আদালতে শুরু হয়েছে বহুল আলোচিত আপিল শুনানি। সকালে ঠিক ৯টা ৪০ মিনিটে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চে প্রধান বিচারপতি ড. সৈয়দ রেফাত আহমেদের নেতৃত্বে সাত সদস্যের বেঞ্চ এই শুনানি শুরু করেন।
আবেদনকারীদের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরছেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ড. শরীফ ভূঁইয়া, অন্যদিকে রাষ্ট্রের পক্ষে লড়ছেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান। আদালতকক্ষ ভরপুর আইনজীবী, সাংবাদিক, নাগরিক সমাজ ও রাজনৈতিক মহলের উপস্থিতিতে—একপ্রকার রাজনৈতিক উত্তেজনার আবহ ছড়িয়ে পড়েছে সর্বোচ্চ আদালত চত্বরে।
এর আগে গত ২৭ আগস্ট তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলের রায় পুনর্বিবেচনার (রিভিউ) আবেদন শুনানি শেষে আপিলের অনুমতি দিয়েছিল আদালত। এরপর একে একে বিশিষ্ট নাগরিক, গবেষক ও রাজনৈতিক নেতারা পৃথকভাবে আপিল করেন। আপিলকারীদের মধ্যে রয়েছেন সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার, সাবেক নির্বাচন কমিশনার এম. হাফিজউদ্দিন খান, প্রশাসন বিশেষজ্ঞ তোফায়েল আহমেদ, সাবেক সচিব জোবাইরুল হক ভূঁইয়া, এবং গবেষক জাহরা রহমান। রাজনৈতিক অঙ্গন থেকেও আপিল করেছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার। এছাড়া নওগাঁর রানীনগরের বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. মোফাজ্জল হোসেনও আবেদনকারীদের তালিকায় আছেন।
বাংলাদেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা প্রথম চালু হয় ১৯৯৬ সালে, সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে। এরপর ১৯৯৮ সালে এর সাংবিধানিক বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে রিট দায়ের করেন আইনজীবী এম. সলিম উল্লাহসহ কয়েকজন। তবে ২০০৪ সালে হাইকোর্ট সংশোধনীটিকে বৈধ ঘোষণা করে রিট খারিজ করে দেন।
পরবর্তীতে ২০০৫ সালে মামলাটি আপিল পর্যায়ে আসে। দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়া শেষে ২০১১ সালের ১০ মে আপিল বিভাগের সাত বিচারপতির পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামতের ভিত্তিতে ত্রয়োদশ সংশোধনীকে অসাংবিধানিক ও বাতিল ঘোষণা করে। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১১ সালের ৩০ জুন জাতীয় সংসদে পাস হয় সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী, যার মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা আনুষ্ঠানিকভাবে বিলুপ্ত হয়।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর আবারও সামনে আসে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহালের দাবি। বিশিষ্ট নাগরিক, গবেষক ও রাজনৈতিক নেতাদের এই দাবি নতুন এক আইনি অধ্যায়ের সূচনা করেছে। এখন আদালতে চলছে সেই দাবির ভাগ্য নির্ধারণী শুনানি—যা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে এক নতুন মোড় আনতে পারে।
দেশজুড়ে এখন একটাই প্রশ্ন ঘুরছে—“ফিরবে কি তত্ত্বাবধায়ক সরকার?” আদালতের এই শুনানি কেবল একটি আইনি প্রক্রিয়া নয়, বরং তা রাজনৈতিক ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনাও বহন করছে।
ফলাফল যাই হোক, আজকের এই শুনানি বাংলাদেশের সংবিধান, রাজনীতি ও গণতন্ত্র—তিনেরই ইতিহাসে নতুন এক অধ্যায় যুক্ত করবে।
আপনার মতামত লিখুন :