টেলিগ্রাফের প্রতিবেদন

ইরান যুদ্ধ ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য নতুন চাপ, দৈনিক ব্যয় প্রায় ১০০ কোটি ডলার


আন্তর্জাতিক ডেস্ক প্রকাশের সময় : মার্চ ৯, ২০২৬, ৪:৩৪ অপরাহ্ন

ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান দীর্ঘায়িত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপও বাড়ছে। প্রতিদিন বিপুল সামরিক ব্যয়, জ্বালানির দামের ঊর্ধ্বগতি এবং ভোটারদের মধ্যে বাড়তে থাকা অসন্তোষ মিলিয়ে এই সংঘাত এখন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে।

ব্রিটিশ দৈনিক দ্য টেলিগ্রাফ–এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানকে ঘিরে চলমান সামরিক কার্যক্রমে যুক্তরাষ্ট্রের দৈনিক ব্যয় প্রায় ১০০ কোটি ডলারের কাছাকাছি পৌঁছেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই ব্যয়ের প্রভাব ধীরে ধীরে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি ও অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও প্রতিফলিত হচ্ছে।

ভার্জিনিয়ার আরলিংটনের কাছে একটি গ্যাস স্টেশনে কর্মরত ৫৬ বছর বয়সী ইয়াম সিতৌলা জানান, গত এক সপ্তাহ ধরে জ্বালানির দাম প্রায় প্রতিদিনই বাড়ছে। কখনো ১০ সেন্ট, কখনো তারও বেশি। গ্রাহকেরা প্রায়ই দাম বাড়ার কারণ জানতে চাইছেন।

হোয়াইট হাউস থেকে কয়েক মাইল দূরের ওই গ্যাস স্টেশনেও ইরানে মার্কিন হামলা শুরুর পর থেকে নিয়মিত মূল্য সমন্বয় করা হচ্ছে। সিতৌলার ভাষায়, স্টেশন মালিক প্রায় প্রতিদিনই ফোন করে মূল্যফলকে নতুন দাম বসাতে নির্দেশ দিচ্ছেন। তার ধারণা, সামনে দাম আরও দেড় ডলার পর্যন্ত বাড়তে পারে।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় জ্বালানির দাম বাড়ছে। বৈশ্বিক তেল পরিবহনের প্রায় ২০ শতাংশ হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে হয়। ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডস ওই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ বন্ধ করার ঘোষণা দেওয়ার পর থেকেই বাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপক সামরিক মোতায়েনের কারণে প্রতিদিনের ব্যয়ও দ্রুত বাড়ছে। কিছু বিশ্লেষকের মতে, সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে মোট ব্যয় ১০০ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে। এতে ট্রাম্পের “মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন” (মাগা) সমর্থকদের একটি অংশের মধ্যেও অস্বস্তি তৈরি হয়েছে।

জনমত জরিপেও দেখা যাচ্ছে, যুদ্ধটি মার্কিন ভোটারদের মধ্যে খুব জনপ্রিয় নয়। বিশেষ করে এমন সময় এই সংঘাত চলছে, যখন মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা রিপাবলিকানদের জন্য বড় রাজনৈতিক পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ক্যাপিটল হিল এলাকার একটি গ্যাস স্টেশনের ব্যবস্থাপক বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে তেলের সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থেকেই আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে যুক্তরাষ্ট্রের খুচরা জ্বালানি বাজারেও।

প্লাইমাউথ ইনস্টিটিউট ফর ফ্রি এন্টারপ্রাইজের ভাইস প্রেসিডেন্ট রিচার্ড স্টার্ন বলেন, জ্বালানির দাম অনেক সময় জনমতের একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হয়ে ওঠে। অতীতেও মার্কিন রাজনীতিতে গ্যাসোলিনের মূল্যবৃদ্ধি রাজনৈতিক জনপ্রিয়তার সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল।

এদিকে রিপাবলিকান দলের ভেতরেও আলোচনা শুরু হয়েছে—বিদেশনীতি ও সামরিক ইস্যুতে অতিরিক্ত মনোযোগ দেওয়া ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য রাজনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করছে কি না। কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারালে প্রশাসন তদন্ত, অভিশংসন বা আইন প্রণয়নের অচলাবস্থার মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।

এ পরিস্থিতিতে প্রশাসনের ভেতরে জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণের সম্ভাব্য উপায় নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। কিছু নীতিনির্ধারক সাময়িকভাবে ফেডারেল গ্যাসোলিন কর কমানো বা বাতিল করার প্রস্তাবও বিবেচনা করছেন।

সাম্প্রতিক জনমত জরিপে দেখা গেছে, মার্কিন ভোটারদের বড় উদ্বেগ এখন জীবনযাত্রার ব্যয়। ওয়াশিংটন পোস্টের এক জরিপে ২৫০০–এর বেশি অংশগ্রহণকারীর মধ্যে ৩০ শতাংশেরও কম বলেছেন তারা আর্থিকভাবে উন্নতির পথে আছেন। অন্যদিকে ৪৫ শতাংশ জানিয়েছেন, খাদ্যপণ্যের দাম তাদের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, যুদ্ধ ব্যয়ের চাপ ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি একসঙ্গে বাড়তে থাকলে তা ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ঝুঁকিতে পরিণত হতে পারে।