ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাত নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের ভেতরে চাপ বাড়ছে। ক্রমবর্ধমান সামরিক ব্যয় ও মার্কিন সেনাদের হতাহতের ঘটনার প্রেক্ষাপটে যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসার উপায় খোঁজার পরামর্শ দিচ্ছেন তার ঘনিষ্ঠ কিছু উপদেষ্টা। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস–এর এক প্রতিবেদনে এমন ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টাদের একজন ডেভিড সাক্স যুক্তরাষ্ট্রকে বর্তমান সংঘাত থেকে কৌশলগতভাবে সরে আসার পথ খুঁজতে বলেছেন। প্রশাসনের ভেতর থেকে যুদ্ধ নিয়ে প্রকাশ্যে অসন্তোষের এটিই প্রথম বড় ইঙ্গিত বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা।
ডেভিড সাক্স একজন মার্কিন উদ্যোক্তা ও প্রযুক্তি বিনিয়োগকারী। তিনি সিলিকন ভ্যালির পরিচিত ভেঞ্চার ক্যাপিটালিস্ট হিসেবে পরিচিত এবং বিভিন্ন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগের জন্য সুপরিচিত। অতীতে তিনি পেপাল–এর নির্বাহী ছিলেন এবং পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্ম ইয়াম্মার প্রতিষ্ঠা করেন, যা পরবর্তীতে মাইক্রোসফট অধিগ্রহণ করে। ট্রাম্প প্রশাসনে তিনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ক্রিপ্টোকারেন্সি–সংক্রান্ত নীতিমালা বিষয়ে উপদেষ্টা হিসেবে যুক্ত রয়েছেন।
ইরানের পারমাণবিক ইস্যু নিয়ে পরোক্ষ আলোচনার মধ্যেই গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা শুরু করে। সেই হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ বেশ কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা নিহত হন বলে বিভিন্ন সূত্রে দাবি করা হয়। এর পরপরই ইরান পাল্টা হামলা শুরু করে এবং সংঘাত দ্রুত বিস্তৃত হয়।
দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে চলা এই সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ঘোষিত লক্ষ্য—ইরানের সরকারকে দুর্বল করা—এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। বরং মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটি ও মিত্র দেশগুলোর স্থাপনায় একাধিক হামলার ঘটনা ঘটেছে।
এদিকে হরমুজ প্রণালির ওপর শক্ত অবস্থান নিয়ে ইরান বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে। বিশ্বের উল্লেখযোগ্য অংশের তেল এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়, ফলে সংঘাতের প্রভাব বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও পড়তে শুরু করেছে।
গত শুক্রবার এক পডকাস্টে ডেভিড সাক্স বলেন, “এখনই যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ‘বিজয় ঘোষণা করে’ সংঘাত থেকে সরে আসার উপযুক্ত সময় হতে পারে।” তার মতে, এমন সিদ্ধান্ত নিলে আর্থিক বাজারেও ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা যেতে পারে।
এই মন্তব্য এমন এক সময়ে এসেছে যখন ট্রাম্প সম্প্রতি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র চাইলে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ “অনির্দিষ্টকাল” চালিয়ে যেতে পারে। তবে পরে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, যুদ্ধ দ্রুত শেষ হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।
শুক্রবার ট্রাম্প দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের গুরুত্বপূর্ণ তেল রপ্তানি কেন্দ্র খারগ দ্বীপের সামরিক স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে বড় ধরনের হামলা চালিয়েছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, যদি ইরান হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বাধা দেয়, তবে ওই দ্বীপের তেল অবকাঠামোও লক্ষ্যবস্তু করা হতে পারে।
ডেভিড সাক্স সতর্ক করেছেন, ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর আরও হামলা হলে সংঘাত বড় আকার নিতে পারে। সে ক্ষেত্রে ইরান উপসাগরীয় দেশগুলোর তেল ও গ্যাস স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করতে পারে, যা পুরো অঞ্চলের জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করবে।
তার মতে, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে ইসরায়েলও বড় ধরনের নিরাপত্তা চাপে পড়তে পারে। দীর্ঘ সময় ধরে হামলা চলতে থাকলে দেশটির আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপরও চাপ বাড়তে পারে।
একই সময়ে ইরান-সমর্থিত একটি অনলাইন অ্যাকাউন্ট কিছু মার্কিন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু হওয়ার দাবি করেছে। সেখানে আমাজন ও ওরাকলের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। প্রযুক্তি খাতের বিভিন্ন শীর্ষ ব্যক্তির সঙ্গে ডেভিড সাক্সের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে বলে জানা যায়।
আপনার মতামত লিখুন :