বাংলাদেশে বাড়তে থাকা শিক্ষিত বেকারত্ব মোকাবিলায় শিক্ষা ব্যবস্থাকে কর্মমুখী ও প্রযুক্তিনির্ভর করার ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, কেবল সনদনির্ভর শিক্ষা নয়, দক্ষতা ও বাস্তবমুখী জ্ঞান অর্জনের অভাবই দেশে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বাড়ার অন্যতম কারণ।
মঙ্গলবার University Grants Commission of Bangladesh আয়োজিত “বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষা রূপান্তর: টেকসই উৎকর্ষতার রোডম্যাপ” শীর্ষক এক কর্মশালায় তিনি এসব কথা বলেন। রাজধানীর University of Dhaka-এর নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে অনুষ্ঠিত এই কর্মশালায় শিক্ষাবিদ, নীতিনির্ধারক ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান বিশ্বে শুধু একাডেমিক ডিগ্রি যথেষ্ট নয়। বৈশ্বিক শ্রমবাজারে টিকে থাকতে হলে শিক্ষার্থীদের প্রযুক্তিগত দক্ষতা, উদ্ভাবনী ক্ষমতা এবং ব্যবহারিক জ্ঞান অর্জন জরুরি। সেই বাস্তবতা বিবেচনায় সরকার প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত শিক্ষা কারিকুলাম পুনর্গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে।
তার ভাষায়, “নৈতিক মূল্যবোধসম্পন্ন কর্মমুখী শিক্ষা ছাড়া বেকারত্ব নিরসন সম্ভব নয়। সময়োপযোগী শিক্ষা ব্যবস্থা ছাড়া বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকাও কঠিন।”
উচ্চশিক্ষা ও কর্মসংস্থানের মধ্যে দীর্ঘদিনের ব্যবধান কমাতে সরকার অ্যাপ্রেন্টিসশিপ, ইন্টার্নশিপ এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের অংশীদারত্ব বাড়ানোর উদ্যোগ নিচ্ছে বলেও জানান তিনি। স্থানীয় শিল্প ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সরাসরি সংযোগ তৈরির পরিকল্পনার কথাও উল্লেখ করেন।
শিক্ষার্থীদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে সিড ফান্ডিং ও ইনোভেশন গ্রান্ট চালুর কথাও বলেন প্রধানমন্ত্রী। তার মতে, বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই তরুণদের কর্মসংস্থান খোঁজার পরিবর্তে কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী হিসেবে প্রস্তুত করা প্রয়োজন।
চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের প্রেক্ষাপটে শিক্ষা ব্যবস্থাকে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার ওপরও জোর দেন তিনি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিক্স, জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং ও বিগ ডাটার মতো প্রযুক্তি প্রচলিত চাকরির ধরন বদলে দিচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ভবিষ্যতের শ্রমবাজারে টিকে থাকতে হলে এখন থেকেই শিক্ষার্থীদের নতুন দক্ষতায় প্রস্তুত করতে হবে।
বিশ্বব্যাপী প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিষ্ঠানের উত্থানের উদাহরণ টেনে তিনি Uber, Facebook, Alibaba Group এবং Airbnb-এর কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, এসব প্রতিষ্ঠানের মূল শক্তি ছিল উদ্ভাবনী ধারণা ও প্রযুক্তিনির্ভর প্ল্যাটফর্ম।
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, বাংলাদেশের তরুণদের মধ্যেও সেই সম্ভাবনা রয়েছে। উপযুক্ত পরিবেশ ও সহায়তা পেলে তারাও বিশ্বমানের উদ্যোগ গড়ে তুলতে সক্ষম হবে।
ভাষণের এক পর্যায়ে তিনি দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও তুলে ধরেন। দীর্ঘ আন্দোলন ও ত্যাগের মধ্য দিয়ে দেশে গণতান্ত্রিক সরকারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বর্তমান সরকার একটি “জ্ঞান ও মেধাভিত্তিক নিরাপদ বাংলাদেশ” গড়ে তুলতে চায়, যেখানে যোগ্যতা ও সৃজনশীলতাই হবে অগ্রগতির প্রধান ভিত্তি।
তবে প্রযুক্তিগত অগ্রগতির পাশাপাশি সামাজিক ও নৈতিক মূল্যবোধ রক্ষার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, আধুনিকায়নের পথে এগোলেও দেশের ধর্মীয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ভিত্তি যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সে বিষয়ে শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক ও নাগরিক সমাজকে সতর্ক থাকতে হবে।
আপনার মতামত লিখুন :