রাষ্ট্রীয় সম্পদ দখল ও ৩ লাখ কোটি টাকার অর্থপাচার: বিএটির নথি তলব করেছে দুদক


বাংলার মুখ প্রতিবেদক প্রকাশের সময় : মে ২৫, ২০২৬, ১০:৪৬ পূর্বাহ্ন

​শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত বহুজাতিক তামাক কোম্পানি ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো (বিএটি) বাংলাদেশ-এর বিরুদ্ধে প্রায় ৩০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৩ লাখ কোটি টাকা) জালিয়াতি ও অর্থপাচারের অভিযোগে নজিরবিহীন অনুসন্ধান শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। গত ৫৫ বছর ধরে সুকৌশলে রাষ্ট্রীয় সম্পদ দখল এবং এই বিপুল পরিমাণ অর্থ লোপাটের অভিযোগ খতিয়ে দেখতে ইতিমধ্যে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে চিঠি পাঠিয়ে নথিপত্র তলব করেছে দুর্নীতিবিরোধী সংস্থাটি।
​দুদকের একটি ঊর্ধ্বতন সূত্র নিশ্চিত করেছে, সম্প্রতি কমিশনের প্রধান কার্যালয় থেকে এই মেগা কেলেঙ্কারির অভিযোগটি অনুসন্ধানের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে অভিযোগের বিভিন্ন আইনি ও আর্থিক দিক গভীরভাবে যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।

​নথিপত্র তলব ও দুদকের অবস্থান:
​এ বিষয়ে জানতে চাইলে দুদকের উপপরিচালক মো. আকতারুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন:
​”অভিযোগের প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটনের লক্ষ্যে আমরা ইতিমধ্যে রেজিস্ট্রার অব জয়েন্ট স্টক কোম্পানিজ অ্যান্ড ফার্মস (আরজেএসসি)-সহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে তথ্য ও নথিপত্র চেয়ে চিঠি পাঠিয়েছি। প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্ত এবং নথিপত্র পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যালোচনা শেষে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

​যেভাবে শুরু ‘রাষ্ট্রীয় সম্পদ’ দখলের খেলা:
​দুদকে জমা হওয়া সুনির্দিষ্ট অভিযোগপত্র থেকে জানা যায়, এই জালিয়াতির সূত্রপাত দেশভাগের সময় থেকে।

​পটভূমি: ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর ‘পাকিস্তান টোব্যাকো কোম্পানি’ (পিটিসি) করাচিতে তাদের কার্যক্রম শুরু করে। ব্যবসা সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে পরবর্তীতে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের চট্টগ্রাম ও ঢাকায় দুটি বিশাল ও আধুনিক উৎপাদন কারখানা স্থাপন করে প্রতিষ্ঠানটি।

​স্বাধীনতার পর জালিয়াতি: ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের পর নিয়ম অনুযায়ী পরিত্যক্ত এই বিপুল পরিমাণ সম্পদের একক মালিকানা বাংলাদেশ সরকারের কাছে হস্তান্তরিত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, তৎকালীন রাজনৈতিক প্রভাব, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং নথিপত্র জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে সরকারি সম্পদটিকে কৌশলে বহুজাতিক কোম্পানি ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো (বিএটি)-এর নিয়ন্ত্রণে নিয়ে যাওয়া হয়।

​নেপথ্যে শক্তিশালী সিন্ডিকেট:
​অভিযোগপত্রে এই জালিয়াতি প্রক্রিয়ার পেছনের মূল কুশীলবদের নাম উঠে এসেছে। তৎকালীন পিটিসি-র ফাইন্যান্স ম্যানেজার এবং পরবর্তী সময়ে সরকারের উচ্চপর্যায়ে আসীন হওয়া কর্মকর্তা জামালুদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট এই পুরো প্রক্রিয়ায় সরাসরি ভূমিকা রাখে।
​সরকারি পদে থেকে বহুজাতিক কোম্পানির স্বার্থরক্ষা এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যক্তিস্বার্থে বা বিদেশি কোম্পানির হাতে তুলে দেওয়ার এই ঐতিহাসিক জালিয়াতির কারণে গত পাঁচ দশকেরও বেশি সময়ে বাংলাদেশ রাষ্ট্র বিপুল আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে।

এক নজরে ক্ষতির খতিয়ান: ​দুদকের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, গত ৫৫ বছরে এই জালিয়াতির কারণে রাষ্ট্রের আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ (আনুমানিক) তুলে ধরা হয়েছে।
মোট আর্থিক ক্ষতি ও অর্থপাচার ২০ থেকে ৩০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
বাংলাদেশি মুদ্রায় রূপান্তর প্রায় ৩,০০,০০০ কোটি (তিন লাখ কোটি) টাকা।
অভিযোগের সময়কাল বিগত ৫৫ বছর (স্বাধীনতার পর থেকে বর্তমান) পর্যন্ত।

মূল সম্পদ: ঢাকা ও চট্টগ্রামের দুটি বৃহৎ উৎপাদন কারখানা ও জমি।
সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, দেশের ইতিহাসে এটি অন্যতম বৃহত্তম করপোরেট জালিয়াতি ও অর্থপাচারের ঘটনা। দুদকের এই অনুসন্ধানের মধ্য দিয়ে অর্ধশতাব্দী ধরে আড়ালে থাকা এক বিশাল রাষ্ট্রীয় লুটের ইতিহাস উন্মোচিত হতে যাচ্ছে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।