ক্ষমতা গ্রহণের পর প্রথম ১০০ দিনেই বহুমাত্রিক আন্তর্জাতিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার। মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক সংঘাত, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা, যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং দক্ষিণ এশিয়ার পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে সরকারকে একই সঙ্গে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার কঠিন পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, নতুন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল দেশের অভ্যন্তরীণ সংস্কার কর্মসূচির পাশাপাশি দ্রুত পরিবর্তনশীল আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়া। ফলে প্রত্যাশিত নীতি সংস্কারের পাশাপাশি সরকারের উল্লেখযোগ্য সময় ব্যয় হয়েছে বৈদেশিক সম্পর্ক ও অর্থনৈতিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায়।
জ্বালানি নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক চাপ
ইরানকে ঘিরে আঞ্চলিক সংঘাত এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের অনিশ্চয়তা বাংলাদেশের জন্য তাৎক্ষণিক অর্থনৈতিক ঝুঁকি তৈরি করে। জ্বালানি তেল, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস এবং কৃষি উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় সারের আমদানিনির্ভর অর্থনীতি হিসেবে বাংলাদেশ সরাসরি এই অস্থিরতার প্রভাব অনুভব করেছে।
অর্থনীতিবিদদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, সরকারের প্রাথমিক অগ্রাধিকার ছিল বিকল্প সরবরাহ চ্যানেল নিশ্চিত করা এবং জ্বালানি আমদানি ব্যবস্থাকে সচল রাখা। সরকারি ও বেসরকারি উভয় পর্যায়ে সমন্বিত পদক্ষেপের ফলে তাৎক্ষণিক সংকট এড়ানো সম্ভব হলেও বৈশ্বিক বাজারের অস্থিরতা দেশের ওপর চাপ অব্যাহত রেখেছে।
একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি প্রবাসী শ্রমিকের নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থান নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আন্তর্জাতিক সংকটকালে প্রবাসী সুরক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত পরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তা আবারও সামনে এসেছে।
নতুন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও নীতিগত রূপান্তরের চেষ্টা
ক্ষমতা গ্রহণের পর সরকার জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ক অভিজ্ঞ কর্মকর্তা খলিলুর রহমান-কে টেকনোক্র্যাট পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব দেয়। তার নেতৃত্বে ‘আগে বাংলাদেশ’ ভিত্তিক বাস্তবমুখী পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হলেও বৈশ্বিক সংকট পরিস্থিতি শুরু থেকেই নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়াকে জটিল করে তোলে।
কূটনৈতিক সূত্রগুলোর মতে, সরকারের লক্ষ্য ছিল আদর্শিক অবস্থানের পরিবর্তে অর্থনৈতিক স্বার্থ ও জাতীয় প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দেওয়া। তবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিভিন্ন দায়িত্ব ও প্রচারণামূলক কার্যক্রমের কারণে পররাষ্ট্রনীতির পূর্ণাঙ্গ কাঠামো এখনো প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক: বাস্তববাদী ধারাবাহিকতা
বিএনপি সরকারের প্রথম ১০০ দিনে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে ধারাবাহিকতা বজায় রাখার প্রবণতা স্পষ্ট হয়েছে। পূর্ববর্তী সরকারের আমলে নেওয়া কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সিদ্ধান্ত বহাল রাখা হয়েছে।
পর্যবেক্ষকদের মতে, বৈশ্বিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান, উন্নয়ন সহযোগিতা এবং রপ্তানি বাজারের বাস্তবতা বিবেচনায় ওয়াশিংটনের সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক বজায় রাখা বাংলাদেশের জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
তবে কিছু বিশ্লেষক মনে করেন, নির্দিষ্ট কিছু বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক চুক্তির দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে আরও বিস্তৃত আলোচনা প্রয়োজন। বিশেষ করে বড় শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের নীতিগত স্বাধীনতা কতটা অক্ষুণ্ণ থাকবে, সেই প্রশ্নও আলোচনায় রয়েছে।
ইউরোপের গুরুত্ব অপরিবর্তিত
কূটনৈতিক মহলের মতে, ইউরোপীয় বাজার বাংলাদেশের রপ্তানি খাতের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের পর সম্ভাব্য বাণিজ্যিক সুবিধা ধরে রাখতে ইউরোপীয় অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করার প্রয়োজন রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ—উভয় অংশীদারের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখাই হবে সরকারের অন্যতম বড় কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ।
ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক: উষ্ণতা ও সতর্কতার মিশ্রণ
দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভারতের সঙ্গে যোগাযোগে কিছু ইতিবাচক অগ্রগতির ইঙ্গিত মিলেছে। উচ্চপর্যায়ের কূটনৈতিক যোগাযোগ বৃদ্ধি পেয়েছে এবং বিভিন্ন ইস্যুতে সংলাপ অব্যাহত রয়েছে।
তবে সীমান্ত, পানি বণ্টন, অবৈধ অনুপ্রবেশ এবং রাজনৈতিক বক্তব্যকে ঘিরে দুই দেশের মধ্যে অস্বস্তির বিষয়গুলো পুরোপুরি দূর হয়নি।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ভবিষ্যতে তিস্তা পানি বণ্টন এবং গঙ্গা চুক্তি-সংক্রান্ত আলোচনা বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায় পরিণত হতে পারে।
ভারত ও বাংলাদেশ-এর মধ্যকার সম্পর্ক আগামী বছরগুলোতে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হচ্ছে।
চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বজায়
অবকাঠামো উন্নয়ন, বিনিয়োগ এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে চীন বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান অংশীদার হিসেবে রয়েছে।
বিএনপি সরকারও এই সম্পর্কের ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছে। তবে বিশ্লেষকরা মনে করেন, চীন-সম্পৃক্ত বড় প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক সংবেদনশীলতাও বিবেচনায় রাখতে হবে।
বিশেষ করে তিস্তা অববাহিকা-সংক্রান্ত যেকোনো বৃহৎ প্রকল্প ভবিষ্যতে কূটনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আসতে পারে।
ভারসাম্যের নীতি: একক বলয়ের বাইরে থাকার চেষ্টা
প্রথম ১০০ দিনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো কোনো একক শক্তিকেন্দ্রের প্রতি অতিরিক্ত নির্ভরশীল না হয়ে বহুমাত্রিক সম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা।
সরকারি ও কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, ঢাকা বর্তমানে এমন একটি নীতি অনুসরণ করছে যেখানে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারত, ইউরোপ এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে সমান গুরুত্ব দিয়ে সম্পর্ক পরিচালনার চেষ্টা করা হচ্ছে।
তবে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ভারসাম্য রক্ষা দীর্ঘমেয়াদে সহজ হবে না। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতা আরও তীব্র হলে বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থান আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
এখনো গুরুত্ব পায়নি কিছু বড় ইস্যু
প্রথম ১০০ দিনের পর্যালোচনায় বিশেষজ্ঞরা কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রের কথা উল্লেখ করেছেন, যেগুলোতে আরও মনোযোগ প্রয়োজন বলে তারা মনে করেন।
এখনো গুরুত্ব পায়নি কিছু বড় ইস্যু-
-রোহিঙ্গা সংকট-এর দীর্ঘমেয়াদি সমাধান
-জলবায়ু কূটনীতি
-প্রবাসী বাংলাদেশিদের সুরক্ষা ও কল্যাণ
-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ
-পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি
আপনার মতামত লিখুন :