শিক্ষা খাতে সরকারি বিনিয়োগ বাড়ানো, শিক্ষক সংকট দূর করা এবং স্কুলগুলোর অবকাঠামোগত সমস্যা সমাধানের দাবিতে ফ্রান্সজুড়ে চলমান ছাত্র আন্দোলন মঙ্গলবার সহিংস রূপ নিয়েছে। দেশটির প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়ঁ ল্যকর্ন্যু ঘটনাটিকে কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় ও সহিংস ছাত্র বিক্ষোভ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজধানী প্যারিসসহ দেশটির বিভিন্ন শহরে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে অভিভাবক ও শিক্ষকরাও বিক্ষোভে অংশ নেন। প্যারিস, স্ত্রাসবুর, রেন ও তুলুজসহ কয়েকটি শহরে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাঁদুনে গ্যাস ব্যবহার করে।
ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, মঙ্গলবার কয়েক ডজন শহরে অনুষ্ঠিত বিক্ষোভ ও মিছিলে আড়াই লাখের বেশি মানুষ অংশ নেন। তবে আন্দোলনকারীদের হিসাবে এ সংখ্যা প্রায় পাঁচ লাখ। হাইস্কুল শিক্ষার্থীদের সংগঠন উঁনিয়ঁ সাঁদিকাল লিসিয়েন (ইউএসএল) জানিয়েছে, প্রায় দুই হাজার হাইস্কুল অবরুদ্ধ বা বন্ধ ছিল।
প্যারিসে প্রায় ৩০০ বিক্ষোভকারী নিরাপত্তা বাহিনীর মুখোমুখি হন। তাদের অধিকাংশের মুখে মাস্ক ছিল বলে জানিয়েছে পুলিশ। বিভিন্ন শহরে সংঘর্ষের সময় কয়েকটি দোকান ও স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও বড় ধরনের সহিংসতা সব জায়গায় ছড়িয়ে পড়েনি।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, মঙ্গলবারের ঘটনায় ৪৮৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং ৪৮ জন নিরাপত্তা সদস্য আহত হয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলমান সংঘর্ষে এখন পর্যন্ত ৭০০-এর বেশি পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। ল্যকর্ন্যু পার্লামেন্টে জানিয়েছেন, এ পর্যন্ত অন্তত ২১৫ জন কিশোর এবং ৮৫ জন স্কুলকর্মীও আহত হয়েছেন।
বিক্ষোভের প্রভাবের কারণে দেশজুড়ে হাইস্কুলের ক্লাস সপ্তাহের বাকি সময়ের জন্য বন্ধ ঘোষণা করেছে সরকার। ল্যকর্ন্যু বলেন, শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর কয়েক দশকের মধ্যে এমন বড় ধরনের ক্ষতি আর দেখা যায়নি।
প্যারিস থেকে আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আন্দোলনে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষও যুক্ত হয়েছেন। কৃষক ইউনিয়ন, জ্বালানি শ্রমিক ও শিক্ষক সংগঠনগুলো শিক্ষার্থীদের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। অভিভাবক ও শিক্ষকরা বলছেন, তারা একদিকে শিক্ষার্থীদের দাবির প্রতি সমর্থন জানাতে এবং অন্যদিকে বিক্ষোভে অনুপ্রবেশকারী উচ্ছৃঙ্খল ব্যক্তিদের পাশাপাশি পুলিশের অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ থেকে সন্তানদের সুরক্ষায় রাস্তায় নেমেছেন।
শিক্ষক সংকট ও স্কুলের অব্যবস্থাপনা
আন্দোলনটি শুরু হয়েছিল সেপ্টেম্বরে প্যারিসের সুবিধাবঞ্চিত শহরতলির কয়েকটি এলাকায়। পরে তা দ্রুত দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, অনেক স্কুলে পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই এবং শিক্ষা খাতে প্রয়োজনের তুলনায় সরকারি অর্থায়ন কম। পাশাপাশি পুরোনো ও জরাজীর্ণ ভবন, পানি চুঁইয়ে পড়া এবং ইঁদুরের উপদ্রবের মতো অবকাঠামোগত সমস্যাও রয়েছে।
মার্সেই, নঁত ও লিওঁ শহরে বিক্ষোভকারীদের হাতে থাকা প্ল্যাকার্ডে ‘তারা আসলে আমাদের নিয়ে ভাবে না’ এবং ‘বেঁচে থাকা না কি পড়াশোনা’—এ ধরনের স্লোগান দেখা যায়।
সরকারের ওপরও অর্থনৈতিক চাপ রয়েছে। ধীরগতির প্রবৃদ্ধির মধ্যে সরকারি ঋণ নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করছে ফ্রান্স। ২০২৪ সালের পার্লামেন্ট নির্বাচনের পর প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রোঁর মিত্ররা সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানোয় বাজেটসহ গুরুত্বপূর্ণ আইন পাস করতেও সরকারকে রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হচ্ছে।
পরিস্থিতি নিয়ে মঙ্গলবার ল্যকর্ন্যু ও অন্যান্য জ্যেষ্ঠ মন্ত্রীকে জরুরি বৈঠকে ডাকেন প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁ।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফ্রান্সের আন্দোলনকে অভিবাসন পরিস্থিতির সঙ্গে যুক্ত করে মন্তব্য করেছেন। তবে রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শিক্ষার্থীদের ঘোষিত দাবিগুলোর মধ্যে অভিবাসন বা ধর্মীয় বিষয় নেই; বরং শিক্ষক সংকট, শিক্ষা খাতে অর্থায়নের ঘাটতি এবং স্কুলের অবকাঠামোগত সমস্যাই তাদের মূল দাবি।
আসন্ন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে ফ্রান্সে রাজনৈতিক মেরুকরণও বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন দেশটির দীর্ঘদিনের শিক্ষা ও অর্থনৈতিক সংকট নিয়ে নতুন করে রাজনৈতিক চাপ তৈরি করেছে।
আপনার মতামত লিখুন :