দেশের ব্যাংকিং খাতে মূলধন ঘাটতি, লাগামহীন খেলাপি ঋণ এবং তীব্র তারল্য সংকট চরম আকার ধারণ করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ কার্যপত্র অনুযায়ী, এ বছরের মার্চ শেষে দেশের ২২টি ব্যাংকের পুঞ্জীভূত লোকসানের পরিমাণ দাঁড়ায় ২ লাখ ৫৩ হাজার ৯৩৮ কোটি টাকায়।
একই সময়ে মূলধন ঋণাত্মক হয়ে পড়েছে ১৫টি ব্যাংকের। সম্প্রতি জাতীয় সংসদের অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির চতুর্থ বৈঠকে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে এ আশঙ্কাজনক চিত্র তুলে ধরা হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, মার্চ প্রান্তিকে পুরো ব্যাংক খাতের পরিচালন মুনাফা ৭৮৯ কোটি টাকা হলেও নিট লোকসানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮ হাজার ৪১৭ কোটি টাকা। মূলত উচ্চমাত্রার খেলাপি ঋণ, প্রয়োজনীয় প্রভিশন ও মূলধন ঘাটতি ব্যাংকগুলোর উপার্জনক্ষমতার ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। পুঞ্জীভূত লোকসানে থাকা ২২টি ব্যাংকের মধ্যে রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা, অগ্রণী, রূপালী ও বেসিক ব্যাংক; বিশেষায়িত বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক ও রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক এবং বেসরকারি ১৫টি ব্যাংকসহ একটি বিদেশি ব্যাংক। বেসরকারি ব্যাংকের তালিকায় ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক, এবি ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক, মেঘনা ব্যাংক, পদ্মা ব্যাংক, সীমান্ত ব্যাংক, দ্য প্রিমিয়ার ব্যাংক, বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংক ও আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এছাড়াও বিদেশি ব্যাংক হিসেবে ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তানও রয়েছে এ তালিকায়।
একই সময়ে তফসিলি ব্যাংকগুলোর মধ্যে ৪০টি সর্বনিম্ন মূলধন সংরক্ষণ করতে পারলেও ১৫টি ব্যাংকের মূলধন ঋণাত্মক হয়ে গেছে। এর ফলে পুরো ব্যাংক খাতের মূলধন পর্যাপ্ততার হার (সিআরএআর) নেমে এসেছে ঋণাত্মক ৩ দশমিক ১৭ শতাংশে। তবে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের অর্থ হিসাব করলে এ হার দাঁড়ায় ঋণাত্মক ২ দশমিক ০৫ শতাংশ। শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকগুলোর মূলধন পরিস্থিতি আরও নাজুক, যেখানে মার্চ শেষে তাদের মূলধন পর্যাপ্ততার হার দাঁড়িয়েছে ঋণাত্মক ৪৪ দশমিক ৭৭ শতাংশে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সতর্ক করে জানিয়েছে যে, মূলধনের এই দুর্বলতা ব্যাংকগুলোর লোকসান সামলানোর ক্ষমতা, নতুন ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা এবং সাধারণ আমানতকারীদের স্বার্থ সুরক্ষাকে মারাত্মক ঝুঁকির মুখে ফেলছে।
অন্যদিকে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পাল্লা দিন দিন আরও ভারী হচ্ছে। জুন প্রান্তিক শেষে ৬১টি তফসিলি ব্যাংকের মোট ১৮ লাখ ৫০ হাজার ৫৯৫ কোটি টাকা ঋণের মধ্যে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের প্রায় ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ। এর মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের হার ৪৭ দশমিক ৩০ শতাংশ এবং বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে এ হার ৩০ দশমিক ৭৪ শতাংশ। খেলাপি ঋণের সম্ভাব্য ক্ষতি সামলাতে যে অর্থ আলাদা রাখার নিয়ম রয়েছে, সেখানে পুরো ব্যাংক খাতে প্রভিশন ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ২২ হাজার ৩৫৮ কোটি টাকা।
ব্যাংক খাতে সামগ্রিকভাবে উদ্বৃত্ত তারল্য থাকলেও তা সুষমভাবে বণ্টিত নয়। তীব্র তারল্য সংকটে ভোগা ১২টি ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছ থেকে ‘লেন্ডার অব লাস্ট রিসোর্ট’ সুবিধায় প্রায় ৮৫ হাজার কোটি টাকার জরুরি ঋণ (ডিমান্ড লোন) নিয়েছে। জরুরি তারল্য সহায়তা নেওয়া বড় ব্যাংকগুলোর মধ্যে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ ১৭ হাজার কোটি টাকা, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক ১৫ হাজার ৮১০ কোটি টাকা, এক্সিম ব্যাংক ১২ হাজার ১০ কোটি টাকা, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক ১০ হাজার ৮৪২ কোটি টাকা এবং ন্যাশনাল ব্যাংক ১০ হাজার ৫৬৮ কোটি টাকা গ্রহণ করেছে। এছাড়া অন্যান্য ব্যাংকের মধ্যে দ্য প্রিমিয়ার ব্যাংক ৪,৯০০ কোটি টাকা, এবি ব্যাংক ৪,২৭০ কোটি টাকা এবং ইউনিয়ন ব্যাংক ৫,৪২১ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে।
সংসদ ভবনে আয়োজিত এই বৈঠকে ব্যাংকিং খাতের আইন সংশোধন ও তদারকি নিয়েও তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করা হয়েছে। বৈঠক শেষে কমিটির সদস্য ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সংসদ সদস্য মো. আবুল হাসনাত (হাসনাত আবদুল্লাহ) জানান, ব্যাংকের পরিচালনায় একই পরিবারের সদস্যসংখ্যা ও পরিচালকদের মেয়াদ বাড়ানোর প্রস্তাবের তারা কড়া বিরোধিতা করেছেন। তিনি অভিযোগ করেন, ব্যাংকগুলোকে আবারও অলিগার্ক ও নির্দিষ্ট পরিবারের হাতে তুলে দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে খেলাপি ঋণের সময়সীমা ৯০ দিন থেকে বাড়িয়ে ২৭০ দিন করার চেষ্টার বিরুদ্ধেও প্রতিবাদ জানানো হয়, কারণ এটি করা হলে খেলাপি ঋণের প্রকৃত ভয়াবহ চিত্র আড়াল পড়ে যাবে। বৈঠকে উপস্থিত অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী পরবর্তী বৈঠকে এসব বিষয়ে বিস্তারিত জবাব দেবেন বলে কমিটিকে আশ্বস্ত করেছেন।
আপনার মতামত লিখুন :