ইরানকে লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্র যে সামরিক প্রস্তুতি জোরদার করছে, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উদ্বেগ বাড়ছে। কূটনৈতিক সমাধান ব্যর্থ হলে এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামরিক অভিযানের নির্দেশ দিলে পরিস্থিতি কোন দিকে গড়াতে পারে—তা নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে নানা মত রয়েছে। বিবিসির একটি বিশ্লেষণে সম্ভাব্য সাতটি চিত্রপট তুলে ধরা হয়েছে।
এই দৃশ্যপটে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি), ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি ও পারমাণবিক স্থাপনায় নিখুঁত হামলা চালাতে পারে। এতে বেসামরিক হতাহতের সংখ্যা কম থাকার সম্ভাবনা থাকলেও ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। তবে ইরাক ও লিবিয়ার অভিজ্ঞতা বলছে, বিদেশি সামরিক হস্তক্ষেপ সরাসরি গণতান্ত্রিক উত্তরণ নিশ্চিত করে না।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক চাপের মুখে ইরানের সরকার ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারে, তবে আঞ্চলিক মিলিশিয়া সমর্থন, ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ও অভ্যন্তরীণ দমননীতিতে কিছুটা নমনীয় হতে বাধ্য হতে পারে। যদিও বিশ্লেষকদের মতে, চার দশকের বেশি সময় ধরে অনমনীয় অবস্থানে থাকা তেহরান হঠাৎ নীতি বদলাবে—এমন সম্ভাবনা কম।
দীর্ঘদিনের বিক্ষোভ ও জনঅসন্তোষের সুযোগে হামলার পর সরকার ভেঙে পড়তে পারে। তবে বেসামরিক নেতৃত্বের বদলে ক্ষমতা চলে যেতে পারে আইআরজিসি-নিয়ন্ত্রিত সামরিক সরকারের হাতে। এতে গণতান্ত্রিক শাসনের বদলে আরও কঠোর সামরিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ইরান আগেই হুঁশিয়ারি দিয়েছে—হামলা হলে জবাব দেওয়া হবে। ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার করে পারস্য উপসাগরের মার্কিন ঘাঁটি, বিশেষ করে বাহরাইন ও কাতারে হামলার ঝুঁকি রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রকে সহায়তাকারী দেশগুলোর অবকাঠামোও লক্ষ্যবস্তু হতে পারে।
বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালীতে ইরান মাইন পেতে দিতে পারে। এই পথে বিশ্ব তেলের প্রায় এক-চতুর্থাংশ পরিবাহিত হয়। এমন পদক্ষেপ বিশ্ব বাণিজ্যে বড় ধাক্কা দিতে পারে এবং জ্বালানির দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে দিতে পারে।
ইরানের আইআরজিসি নৌবাহিনী ঝাঁক আক্রমণ কৌশলে দক্ষ। দ্রুতগামী নৌকা, ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্রের সমন্বিত হামলায় কোনো মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত বা ডুবে গেলে তা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় সামরিক ও রাজনৈতিক ধাক্কা হবে। যদিও এমন ঘটনা বিরল, তবে পুরোপুরি অসম্ভব নয়।
সবচেয়ে ভয়াবহ চিত্রপট হলো—কেন্দ্রীয় শাসন ভেঙে পড়ে ইরানে সিরিয়া বা লিবিয়ার মতো গৃহযুদ্ধ শুরু হওয়া। এতে জাতিগত সংঘাত, শরণার্থী স্রোত ও মানবিক সংকট সৃষ্টি হতে পারে, যার প্রভাব পড়বে পুরো মধ্যপ্রাচ্যে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান—দু’পক্ষই জানে যে সরাসরি সংঘাতের পরিণতি হবে অনিশ্চিত ও বিপজ্জনক। তবুও সামরিক শক্তি প্রদর্শনের রাজনীতি পরিস্থিতিকে এমন এক পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারে, যেখানে একটি ভুল সিদ্ধান্তই বড় আকারের যুদ্ধের সূচনা ঘটাতে পারে—যার শেষ কোথায়, তা কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারছে না।
আপনার মতামত লিখুন :