আজিজ খানের ব্যাংক হিসাব জব্দ ও ভূমি অধিগ্রহণের নির্দেশ


আন্তর্জাতিক ডেস্ক প্রকাশের সময় : ফেব্রুয়ারী ১৫, ২০২৬, ১২:৪৯ অপরাহ্ন

সিঙ্গাপুরে বসবাসরত বাংলাদেশের শীর্ষ ধনী ও সামিট গ্রুপের চেয়ারম্যান মুহাম্মদ আজিজ খানের ব্যাংক হিসাব জব্দ ও ভূমি অধিগ্রহণের নির্দেশ দিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। অর্থ পাচারের অভিযোগে তার পরিবারের সদস্য ও ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের বিরুদ্ধেও একই ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এই ব্যবসায়ী।

মুহাম্মদ আজিজ খান জানান, তার সঙ্গে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি), জয়েন্ট স্টক কোম্পানি ও ফার্মের নিবন্ধক (আরজেএসসি) এবং আয়কর কর্তৃপক্ষ যোগাযোগ করেছে।
তিনি বলেন, “আমাদের পক্ষ থেকে সরকারের যে কোনো তদন্তে পূর্ণ সহযোগিতা করা হচ্ছে। আমরা নিশ্চিত, তদন্ত শেষে সত্য প্রকাশ পাবে।”
তিনি আরও দাবি করেন, তার বা তার কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে কোনো মামলা দায়ের করা হয়নি।

ভাই কারাগারে, তালিকায় শীর্ষ ধনী:
আজিজ খানের ভাই মুহাম্মদ ফারুক খান। তিনি একসময় বাংলাদেশের বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী ছিলেন। ২০২৪ সালে এক রাজনৈতিক কর্মী হত্যার অভিযোগে গ্রেপ্তার হন। বর্তমানে তিনি বিচারাধীন অবস্থায় কারাগারে আছেন।
৭০ বছর বয়সী আজিজ খান ২০২৫ সালে ফোর্বসের তালিকায় সিঙ্গাপুরের ৪৯তম ধনী ব্যক্তি হিসেবে স্থান পান। তার নিট সম্পদের পরিমাণ ধরা হয় ১ দশমিক ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। তিনি বাংলাদেশের অবকাঠামো খাতে সক্রিয় শিল্পগোষ্ঠী সামিট গ্রুপের চেয়ারম্যান। বিদ্যুৎ, বন্দর, ফাইবার অপটিকস ও রিয়েল এস্টেট খাতে তাদের বিনিয়োগ রয়েছে।
গ্রুপটির ফ্ল্যাগশিপ প্রতিষ্ঠান সামিট পাওয়ার ইন্টারন্যাশনাল ২০১৬ সালে সিঙ্গাপুরে নিবন্ধিত হয়। প্রতিষ্ঠানটি নিজেদের দক্ষিণ এশিয়ার শীর্ষ অবকাঠামো উন্নয়ন ও পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচয় দেয়।
২০১৯ সালে জাপানি জ্বালানি জায়ান্ট জিইআরএ কো. কোম্পানিটির ২২ শতাংশ শেয়ার ৩৩০ মিলিয়ন ডলারে কিনে নেয়, যা সে সময় কোম্পানির মূল্যায়ন দাঁড়ায় ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার।

বাংলাদেশে প্রথম স্বাধীন বিদ্যুৎকেন্দ্র:
আজিজ খান ১৯৭০-এর দশকে সিঙ্গাপুরে পাড়ি জমান। ব্যবসায়িক ক্যারিয়ারের শুরুতে থার্মোপ্লাস্টিক পণ্যের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও পরবর্তীতে সার ও মোলাসেস রপ্তানিতে যুক্ত হন। ১৯৯৭ সালে তিনি বাংলাদেশে প্রথম বেসরকারি স্বাধীন বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করেন। বর্তমানে তার প্রতিষ্ঠান দেশের বৃহত্তম স্বাধীন বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী হিসেবে ১১টি বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনা করছে।
তিনি ১৯৮৮ সালে সিঙ্গাপুরের স্থায়ী বাসিন্দা হন এবং ২০২৩ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারির মধ্যে সিঙ্গাপুরের নাগরিকত্ব গ্রহণ করেন। তার জীবনী অনুযায়ী, তিনি ইউনিসেফ-এর আন্তর্জাতিক কাউন্সিলের সদস্য এবং ২০১৬ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে ফিনল্যান্ডের অনারারি কনসাল জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তদন্ত জোরদার:
২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র আন্দোলনের মুখে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে চলে যান। পরবর্তীতে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় এবং দুর্নীতির মামলায়ও দোষী সাব্যস্ত করা হয়। তার স্থলাভিষিক্ত হন নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূস। তবে ১২ ফেব্রুয়ারির সাধারণ নির্বাচনে বিএনপির জয়ের পর অন্তর্বর্তী নেতৃত্বে পরিবর্তন আসছে। এক বছর আগে ড. ইউনূসের কমিশন করা এক শ্বেতপত্রে দাবি করা হয়, শেখ হাসিনার দীর্ঘ ১৫ বছরের শাসনামলে প্রায় ২৩৪ বিলিয়ন ডলার অবৈধভাবে বিদেশে পাচার হতে পারে। শ্বেতপত্রে সামিট গ্রুপের একটি এলএনজি প্রকল্পের অনিয়মের অভিযোগ ওঠার পর তা বাতিল করে ইউনূস প্রশাসন। তবে সামিট জানায়, বিদ্যুৎ খাতে কর অব্যাহতি শুধু তাদের জন্য নয়, পুরো খাতের জন্যই প্রযোজ্য ছিল। বাংলাদেশের আদালত ২০২৫ সাল থেকে আজিজ খান ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে দেশে-বিদেশে নগদ অর্থ, শেয়ার ও জমি জব্দের নির্দেশ দিয়েছে। এর মধ্যে লুক্সেমবার্গে থাকা ৪ দশমিক ১ মিলিয়ন ইউরো মূল্যের শেয়ার, বাংলাদেশে অন্তত ৪১ দশমিক ৭৪ কোটি টাকা এবং ৩৮ হাজার ৮০০ বর্গফুট জমি রয়েছে।

দ্বিতীয় বিলিয়নিয়ার মাসুদও তদন্তে:

আজিজ খানের পাশাপাশি বাংলাদেশে তদন্তের মুখে পড়েছেন আরেক বিলিয়নিয়ার সাইফুল আলম মাসুদ। তিনি এস আলম গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান। খাদ্য, উৎপাদন, জ্বালানি, পরিবহন, রিয়েল এস্টেট ও টেলিযোগাযোগসহ বিভিন্ন খাতে তাদের ব্যবসা বিস্তৃত। তার ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে আর্থিক অপরাধের মামলা হয়েছে। আদালত তার স্বেচ্ছায় বাংলাদেশি নাগরিকত্ব ত্যাগের অনুমতি স্থগিত করেছে এবং ইন্টারপোল রেড নোটিশ জারির অনুরোধ করতে দুদককে নির্দেশ দিয়েছে। তার মার্কিন আইনজীবীরা ওয়াশিংটনে আন্তর্জাতিক সালিসি মামলা করেছেন। তারা দাবি করেন, তাদের মক্কেল ‘টার্গেটেড’ ও ‘অবৈধ’ সম্পদ জব্দের শিকার।

ভবিষ্যৎ বিনিয়োগে অনিশ্চয়তা

আজিজ খান বলেন, চলমান তদন্ত তার ব্যবসায় তাৎক্ষণিক ক্ষতি করেনি; বরং কিছু ক্ষেত্রে উন্নতি হয়েছে। তবে ১ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগে ডেটা সেন্টার স্থাপনের পরিকল্পনা স্থবির হয়ে আছে। তার ভাষায়, “বাংলাদেশে বিদ্যুৎ উদ্বৃত্ত আছে। আমরা ডেটা সেন্টার করতে চাই। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে তা এগোচ্ছে না।”
সিঙ্গাপুরের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, পারস্পরিক আইনি সহায়তা আইনের আওতায় প্রয়োজনে বিদেশি কর্তৃপক্ষকে সহায়তা দেওয়া যায়, সম্পদ জব্দ ও তথ্য বিনিময় করা যায়—তবে তা কেস-বাই-কেস ভিত্তিতে।