তেলবাজারে স্বস্তি আনতে সমঝোতার চেষ্টা, তবে রিপাবলিকান কট্টরপন্থীদের বিরোধিতায় সংকুচিত হচ্ছে রাজনৈতিক পথ

ইরান চুক্তি নিয়ে নিজ দলেই চাপে ট্রাম্প


আন্তর্জাতিক ডেস্ক প্রকাশের সময় : মে ২৯, ২০২৬, ১০:২৭ অপরাহ্ন

ইরানের সঙ্গে চলমান উত্তেজনা ও যুদ্ধ পরিস্থিতি নিরসনে সম্ভাব্য একটি অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তি নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট Donald Trump এখন জটিল রাজনৈতিক চাপে পড়েছেন। একদিকে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে স্থিতিশীলতা ফেরানো এবং যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানি তেলের দাম কমানোর চাপ, অন্যদিকে নিজ দলের কট্টর রিপাবলিকান নেতাদের কঠোর বিরোধিতা— দুই দিক থেকেই চাপ বাড়ছে হোয়াইট হাউসের ওপর।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি সম্ভাব্য খসড়া চুক্তি নিয়ে সমঝোতার কাছাকাছি পৌঁছেছে। প্রস্তাবিত এই সমঝোতা কার্যকর হলে চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া সংঘাতের পর তা হবে সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক অগ্রগতি। একই সঙ্গে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে গুরুত্বপূর্ণ Strait of Hormuz পুনরায় স্বাভাবিকভাবে উন্মুক্ত হওয়ার সম্ভাবনাও তৈরি হবে।

তবে আলোচনার অন্যতম বিতর্কিত দিক হচ্ছে— যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানো এবং হরমুজ প্রণালি চালু রাখার বিনিময়ে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা আপাতত স্থগিত রাখার প্রস্তাব। আর এ কারণেই ট্রাম্প প্রশাসনের ভেতর ও রিপাবলিকান দলে অসন্তোষ বাড়ছে।

রিপাবলিকান সিনেটর Lindsey Graham, Roger Wicker এবং Ted Cruz প্রকাশ্যে ট্রাম্পকে কোনো ধরনের “নরম অবস্থান” না নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তাদের অভিযোগ, সম্ভাব্য এই চুক্তি মূলত Joint Comprehensive Plan of Action-এর পুনরাবৃত্তি হতে পারে— যে চুক্তিকে ট্রাম্প নিজেই প্রথম মেয়াদে বাতিল করেছিলেন।

হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে ইরান যেন কখনো পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে না পারে, সেই নিশ্চয়তা ছাড়া কোনো চূড়ান্ত চুক্তি হবে না।

তবে ইতোমধ্যে ফাঁস হওয়া খসড়া নথিতে ইরানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার কিংবা হরমুজ প্রণালির দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা কাঠামো নিয়ে সুস্পষ্ট রূপরেখা নেই। ফলে সমালোচকদের মতে, ট্রাম্পের পূর্বঘোষিত “শর্তহীন আত্মসমর্পণ” কিংবা ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা সম্পূর্ণ ধ্বংসের অবস্থান থেকে এই সমঝোতা অনেকটাই সরে এসেছে।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক থিংক ট্যাংক United Against Nuclear Iran-এর নীতিনির্ধারণ পরিচালক Jason Brodsky সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, “যদি খসড়া শর্তগুলো সত্যি হয়, তাহলে এই সমঝোতায় যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে ইরানই বেশি সুবিধা পাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে।”

এদিকে সামনে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন ঘনিয়ে আসায় রাজনৈতিক চাপ আরও বাড়ছে। বিশ্লেষকদের মতে, জ্বালানি তেলের উচ্চমূল্য অব্যাহত থাকলে রিপাবলিকানদের জন্য কংগ্রেসে সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখা কঠিন হতে পারে। যদিও ট্রাম্প সাম্প্রতিক এক মন্ত্রিসভা বৈঠকে বলেছেন, তিনি মধ্যবর্তী নির্বাচন নিয়ে উদ্বিগ্ন নন।

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরাও মনে করছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে ইরান নিজেকে তুলনামূলক শক্ত অবস্থানে দেখছে। কারণ সামরিক চাপ মোকাবিলার পাশাপাশি তারা বৈশ্বিক তেল সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালিকে কার্যত প্রভাবিত করার সক্ষমতা দেখিয়েছে।

ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান Center for Strategic and International Studies-এর মধ্যপ্রাচ্য বিশেষজ্ঞ Jon Alterman বলেন, “ট্রাম্প দ্রুত এই সংঘাতের অবসান চান বলেই মনে হচ্ছে। আর সেটিই ইরানকে আলোচনায় আরও অনড় অবস্থান নিতে উৎসাহ দিচ্ছে।”

বিশ্লেষকদের মতে, সম্ভাব্য এই চুক্তি শুধু মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতেই নয়, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার, মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং আগামী নির্বাচনের গতিপথেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।