৯ বছরেও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন অনিশ্চিত, যুদ্ধ-নিরাপত্তা-নাগরিকত্বে আটকে ফেরা


দৈনিক বাংলার মুখ ডেস্ক প্রকাশের সময় : অগাস্ট ২৫, ২০২৬, ১:৪৮ অপরাহ্ন
৯ বছরেও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন অনিশ্চিত, যুদ্ধ-নিরাপত্তা-নাগরিকত্বে আটকে ফেরা

২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের রাখাইনে সামরিক নিপীড়নের মুখে বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের ঢল নামে। কয়েক দিনের মধ্যেই সাত লাখের বেশি বাস্তুচ্যুত মানুষ আশ্রয় নেন কক্সবাজারের শরণার্থীশিবিরে। এরপর কেটে গেছে নয় বছর। প্রত্যাবাসন নিয়ে নানা উদ্যোগ ও আলোচনা হলেও এখনো একজন রোহিঙ্গাকেও স্থায়ীভাবে নিজ দেশে ফেরানো সম্ভব হয়নি।

সময়ের সঙ্গে বদলেছে রাখাইনের রাজনৈতিক ও সামরিক পরিস্থিতি। মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও আরাকান আর্মির সংঘাত, নিরাপত্তাহীনতা, নাগরিকত্বের সংকট এবং জমি-বাড়ির মালিকানা নিয়ে অনিশ্চয়তা প্রত্যাবাসনকে আরও জটিল করে তুলেছে। ফলে দীর্ঘ শরণার্থীজীবনের পরও নিজ ঘর ও পরিচয়ে ফেরার আকাঙ্ক্ষা থাকলেও সেই পথ এখনো বন্ধ।

২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট পরিবারের চার সদস্যকে নিয়ে উখিয়ার কুতুপালংয়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন রোহিঙ্গা যুবক মোহাম্মদ আরিফুল্লাহ। তার ভাষায়, মিয়ানমার সেনাবাহিনীর হাত থেকে প্রাণ বাঁচাতে আট দিন হেঁটে বাংলাদেশে এসেছিলেন তিনি। এত বছর পরও নিজের দেশেই ফিরতে চান তিনি।

প্রত্যাবাসনের বড় বাধা রাখাইনের যুদ্ধ

বর্তমানে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে রাখাইনের চলমান সংঘাত। মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও আরাকান আর্মির লড়াইয়ের কারণে রাজ্যটির বড় অংশ অস্থিতিশীল। বিদ্রোহী গোষ্ঠীটির নিয়ন্ত্রণ বাড়ায় প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে তৈরি হয়েছে নতুন বাস্তবতা।

২০২৪ ও ২০২৫ সালেও রাখাইনে সংঘাতের কারণে নতুন করে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেন। ইউএনএইচসিআরের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গার সংখ্যা ১২ লাখের বেশি। তাদের অধিকাংশই উখিয়া ও টেকনাফের ৩৩টি শরণার্থীশিবিরে বসবাস করছেন।

নিরাপত্তা ও নাগরিকত্বের নিশ্চয়তা নিয়ে শঙ্কা

নিজ দেশে ফেরার পর নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত হবে কি না—এটাই রোহিঙ্গাদের অন্যতম বড় উদ্বেগ। ইউএনএইচসিআরের কক্সবাজার সাব-অফিসের প্রধান মার্সেল কলুন বলেন, প্রত্যাবাসনের জন্য প্রথমে চলমান সংঘাত বন্ধ হওয়া জরুরি। পাশাপাশি নিরাপত্তা, নিজ ভূমিতে ফেরার সুযোগ, জমি-বাড়ির অধিকার এবং মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।

নাগরিকত্বের প্রশ্নও দীর্ঘদিনের সংকট। মিয়ানমারের ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইনের কারণে রোহিঙ্গাদের বড় একটি অংশ রাষ্ট্রহীন অবস্থায় রয়েছে। নাগরিকত্ব ও সমঅধিকার নিশ্চিত না হলে প্রত্যাবাসন টেকসই হবে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

অধিকারকর্মী সৈয়দ উল্লাহর মতে, রোহিঙ্গাদের জন্য নিরাপদ প্রত্যাবাসনই একমাত্র সমাধান।

তালিকা যাচাইয়ে ধীরগতি

প্রত্যাবাসনের প্রস্তুতিতে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে রোহিঙ্গাদের তালিকা যাচাইও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে আছে। বাংলাদেশ ৮ লাখ ২৮ হাজার ৮২৪ রোহিঙ্গার তালিকা দিয়েছে। গত ৩১ জুলাই পর্যন্ত মিয়ানমার ৪ লাখ ২৬ হাজার ৫৪৫ জনের তথ্য যাচাই করেছে। এর মধ্যে ৩ লাখ ৮ হাজার ৭৯৭ জনকে রাখাইনের সাবেক বাসিন্দা হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে।

তবে তালিকা যাচাইয়ের এই অগ্রগতি এখনো বাস্তব প্রত্যাবাসনে রূপ নেয়নি। মিয়ানমারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, নিরাপত্তা পরিস্থিতি স্থিতিশীল হলে যাচাই করা ব্যক্তিদের ফিরিয়ে নেওয়া হবে।

পুরোনো বাড়ি-ভূমিতে ফিরতে পারবেন রোহিঙ্গারা?

প্রত্যাবাসন হলেও রোহিঙ্গারা নিজেদের পুরোনো গ্রামে ফিরতে পারবেন কি না, জমি-বাড়ির মালিকানা ফিরে পাবেন কি না কিংবা কাজ ও জীবিকার অধিকার নিশ্চিত হবে কি না—এসব প্রশ্নের এখনো স্পষ্ট উত্তর নেই।

কক্সবাজার সিভিল সোসাইটির সভাপতি আবু মোর্শেদ চৌধুরী খোকা বলেন, শুধু মানুষকে সীমান্তের ওপারে পাঠিয়ে দেওয়াই প্রত্যাবাসন নয়; নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণভাবে ফেরার নিশ্চয়তাও থাকতে হবে।

স্থানীয়দেরও প্রত্যাবাসনের দাবি

দীর্ঘ নয় বছরে রোহিঙ্গা সংকটের প্রভাব পড়েছে উখিয়া ও টেকনাফের স্থানীয় জনজীবন, পরিবেশ, অর্থনীতি ও নিরাপত্তায়। স্থানীয় বাসিন্দারাও রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও টেকসইভাবে নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার প্রত্যাশা করছেন।

শরণার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, রোহিঙ্গা সংকট এখন আর বাংলাদেশের একার সমস্যা নয়; এটি আন্তর্জাতিক সংকটে পরিণত হয়েছে। প্রত্যাবাসনের রূপরেখা তৈরি ও সংকট সমাধানে সরকার আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছে।

আন্তর্জাতিক চাপ, বাংলাদেশ-মিয়ানমার আলোচনা এবং রোহিঙ্গাদের তালিকা যাচাই—সবই চলছে। কিন্তু নয় বছর পরও বাস্তবে একজন রোহিঙ্গাকেও নিজ দেশে ফেরানো সম্ভব হয়নি। ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পর থেকে দিনটি রোহিঙ্গারা গণহত্যা স্মরণ দিবস হিসেবে পালন করে আসছেন।