চীনের নতুন প্রজন্মের হাইপারসনিক অস্ত্র যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক বিমানকে হাজার কিলোমিটার দূর থেকে লক্ষ্যবস্তু বানানোর সক্ষমতা অর্জন করছে বলে জানিয়েছে ব্লুমবার্গ। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভবিষ্যতে চীন-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত হলে এই প্রযুক্তি মার্কিন বিমান অভিযান ও যুদ্ধক্ষেত্রে কমান্ড কাঠামোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, চীনা সামরিক বাহিনী এমন হাইপারসনিক গ্লাইড ভেহিকল (HGV) তৈরি করেছে, যা আকাশ থেকে আকাশে হামলার অস্ত্র বহন করতে সক্ষম। এর মাধ্যমে যুদ্ধক্ষেত্রের অনেক দূরে অবস্থান করা গুরুত্বপূর্ণ সামরিক বিমান—বিশেষ করে কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণ বিমান—আক্রমণের আওতায় আসতে পারে।
ঝুঁকিতে ট্যাংকার ও কমান্ড বিমান
নতুন সক্ষমতার কারণে আকাশে জ্বালানি সরবরাহকারী ট্যাংকার, আগাম সতর্কতা ও নিয়ন্ত্রণ বিমান এবং উড়ন্ত কমান্ড পোস্টগুলো ঝুঁকিতে পড়তে পারে। এর মধ্যে মার্কিন বিমানবাহিনীর E-4B Nightwatch-এর মতো বিমানও রয়েছে, যেগুলো সাধারণত সম্ভাব্য হামলার এলাকা থেকে অনেক দূরে অবস্থান করে।
ব্লুমবার্গের প্রতিবেদনে বিষয়টির সঙ্গে পরিচিত এক ব্যক্তির বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, চীন তার কিছু হাইপারসনিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রেও আকাশ থেকে আকাশে হামলার সক্ষমতা যুক্ত করেছে। পাশাপাশি কয়েক ধরনের ক্ষেপণাস্ত্রে জাহাজবিধ্বংসী সক্ষমতাও যুক্ত করা হয়েছে।
বড় হচ্ছে চীনের ক্ষেপণাস্ত্রভান্ডার
পেন্টাগনের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সাল পর্যন্ত চীনের কাছে অন্তত ৩ হাজার ১৫০টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং প্রায় ৩০০টি স্থল থেকে উৎক্ষেপণযোগ্য ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ছিল।
২০১৫ সালের তুলনায় ২০২৪ সালে চীনের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের সংখ্যা ১৪৭ শতাংশ বেড়েছে। একই সময়ে স্থল থেকে উৎক্ষেপণযোগ্য ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ৫০ শতাংশ।
যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহিনীর China Aerospace Studies Institute-এর ২০২৬ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চীনের ক্ষেপণাস্ত্র আধুনিকীকরণে এখন প্রতিপক্ষের সামরিক ব্যবস্থার বিভিন্ন অংশে সমন্বিতভাবে আঘাত হানার সক্ষমতাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
কীভাবে কাজ করে হাইপারসনিক গ্লাইড ভেহিকল
হাইপারসনিক গ্লাইড ভেহিকল হলো এমন একটি ওয়ারহেড, যা ক্ষেপণাস্ত্রের মাধ্যমে উচ্চতায় পৌঁছানোর পর বায়ুমণ্ডলের ভেতর অত্যন্ত দ্রুতগতিতে চলতে পারে। প্রচলিত ব্যালিস্টিক ওয়ারহেডের তুলনায় এর গতিপথ পরিবর্তনের সক্ষমতা বেশি হওয়ায় আগাম শনাক্ত ও প্রতিহত করা কঠিন হতে পারে।
চীনের DF-17 ক্ষেপণাস্ত্র থেকে উৎক্ষেপণ করা HGV প্রায় ২ হাজার ৪১৪ কিলোমিটার পর্যন্ত যেতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এই দূরত্ব চীন থেকে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটি গুয়ামের দূরত্বের কাছাকাছি।
আরও উন্নত DF-27 ক্ষেপণাস্ত্রের সর্বোচ্চ পাল্লা প্রায় ৮ হাজার কিলোমিটার বলে ধারণা করা হয়। এর ফলে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক অবস্থানগুলোও সম্ভাব্য ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে।
তবে এত দূরের চলমান বিমানকে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে আঘাত করা অত্যন্ত জটিল। ক্ষেপণাস্ত্রের সর্বোচ্চ পাল্লায় পৌঁছাতে ২০ মিনিট বা তার বেশি সময় লাগতে পারে। এ সময়ের মধ্যে লক্ষ্যবস্তুর অবস্থান সম্পর্কে নির্ভুল ও হালনাগাদ তথ্য পাওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
পারমাণবিক হামলা নিয়ে ভুল বোঝাবুঝির ঝুঁকি
এ ধরনের দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারে আরেকটি কৌশলগত ঝুঁকি রয়েছে। বড় ধরনের সংঘাতের সময় একটি প্রচলিত ক্ষেপণাস্ত্র হামলাকে পারমাণবিক হামলা হিসেবে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা হলে পরিস্থিতি দ্রুত আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।
পাল্টা সক্ষমতা গড়ছে যুক্তরাষ্ট্রও
দূরপাল্লার আকাশ থেকে আকাশে হামলার অস্ত্রের গুরুত্ব বাড়ায় যুক্তরাষ্ট্রও এ ধরনের প্রযুক্তি উন্নয়নে জোর দিচ্ছে। মার্কিন নৌবাহিনী সম্প্রতি AIM-424 MALICE নামে নতুন একটি আকাশ থেকে আকাশে হামলার ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা করেছে। এর পাল্লা ৩০০ মাইলের বেশি বলে জানানো হয়েছে।
ফলে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তির প্রতিযোগিতা এখন শুধু স্থল বা সমুদ্রভিত্তিক লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। দূরবর্তী আকাশসীমায় থাকা জ্বালানি, নজরদারি ও কমান্ড বিমানকে লক্ষ্য করার সক্ষমতা ভবিষ্যৎ আকাশযুদ্ধের কৌশলও বদলে দিতে পারে।
আপনার মতামত লিখুন :