আইনশৃঙ্খলা ও আদালতের পবিত্র অঙ্গনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে আবারও বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছেন চিত্রনায়িকা পরীমনি। মারধর ও ভাঙচুরের একটি মামলায় জামিন নিতে এসে আদালত চত্বরে তার নিরাপত্তারক্ষীদের মারমুখী আচরণ এবং ঔদ্ধত্যপূর্ণ কর্মকাণ্ডে চরম উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে লাঞ্ছিত হয়েছেন সাংবাদিক। আর নিরাপত্তা বেষ্টনী ও পেশিশক্তির মহড়ায় মাথা ফেটে রক্তাক্ত হয়েছেন এক সাধারণ বিচারপ্রার্থী।
আইনের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি ও শোডাউনের মহড়া:
ব্যবসায়ী নাসির উদ্দিন মাহমুদের করা মারধর, ভাঙচুর ও ভয়ভীতি দেখানোর মামলায় আগের দিন আদালত জামিন বাতিল করে। গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করায় বাধ্য হয়ে বৃহস্পতিবার সকালে ঢাকার চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে আত্মসমর্পণ করেন পরীমনি। কিন্তু নিয়মতান্ত্রিক আইনি প্রক্রিয়ার চেয়েও তার ব্যক্তিগত লস্কর ও দেহরক্ষীদের মহড়া ছিল বেশি চোখে পড়ার মতো।
কালো পোশাক পরিহিত ১১ জন ব্যক্তিগত নিরাপত্তারক্ষী এবং সাধারণ পোশাকে আরও বেশ কয়েকজন মিলে পুরো আদালত চত্বরকে এক প্রকার অবরুদ্ধ করে রাখেন। সাধারণ মানুষ ও বিচারপ্রার্থীদের চলাচলে বিঘ্ন ঘটিয়ে এক ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করা হয়।
সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে সাংবাদিকের মোবাইল ছিনতাই:
সকাল ১১টা ৪০ মিনিটের দিকে আদালতের কার্যক্রম শেষে এজলাসের উদ্দেশে যাওয়ার সময় এবং পরবর্তীতে লিফটে ওঠার মুহূর্তে সংবাদ সংগ্রহ করতে গেলে পেশাদার সাংবাদিকদের ওপর চড়াও হন পরীমনির সাঙ্গোপাঙ্গরা। সমকালের মাল্টিমিডিয়া রিপোর্টার রবিউল হোসাইন ভিডিও ধারণ করতে গেলে খোদ পরীমনি নিজেই তার হাত থেকে মোবাইল কেড়ে নেন। পরবর্তীতে ভুক্তভোগী সাংবাদিক তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে টান দিয়ে মোবাইল ফিরিয়ে নেন। কেবল এখানেই ক্ষান্ত হননি এই চিত্রনায়িকা; নিচতলায় গাড়িতে ওঠার আগেও ওই সংবাদকর্মীকে দেখে তেড়ে যান। সাংবাদিকদের অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেন পরীমনি।
নিরাপত্তারক্ষীদের বেপরোয়া ধাক্কায় বিচারপ্রার্থীর মাথা ফাটল:
পরীমনির পেশিশক্তি প্রদর্শনের শিকার হয়েছেন এক নিরীহ বিচারপ্রার্থীও। আদালত চত্বরে তার বিশাল নিরাপত্তা বহরের বেপরোয়া ধাক্কাধাক্কিতে সুজন চন্দ্র মনি দাস নামের এক বিচারপ্রার্থীর মাথা ফেটে রক্ত ঝরতে দেখা যায়। আহত সুজন চন্দ্রের ভাই ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, তারা নিছক মামলার কাজে আদালতে উপস্থিত হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। কিন্তু পরীমনির লাঠিয়াল বাহিনীর তাণ্ডবে তাদের পরিবারের এক সদস্যকে রক্তাক্ত হতে হয়েছে।
দীর্ঘ টানাপোড়েন ও আইনি জটিলতা:
উল্লেখ্য ২০২২ সালের ৬ জুলাই ব্যবসায়ী নাসির উদ্দিন মাহমুদ এই মারধর ও ভয়ভীতি দেখানোর মামলাটি দায়ের করেন। দীর্ঘ তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়া শেষে পিবিআইয়ের তদন্তে অপরাধের সত্যতা প্রমাণিত হয়। এই মামলায় আদালত গত বছর অভিযোগ গঠন করেন। তবে বারবার হাজিরা এড়ানো এবং আদালতের আদেশকে তোয়াক্কা না করার পুরনো প্রবণতা আবারও স্পষ্ট হলো এই ঘটনায়।
আইন সবার জন্য সমান হলেও বারবার এমন ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ ও আদালত প্রাঙ্গণে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করার ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভের ঝড় উঠেছে। তারকা পরিচয়ের আড়ালে এমন আচরণ আইনের শাসনের মুখে এক বড় ধরণের উপহাস বলেই মনে করছেন সচেতন নাগরিকরা।
আপনার মতামত লিখুন :