শাস্ত্রীয় নৃত্যের অপূর্ব আয়োজনে মুগ্ধ দর্শক, উপচে পড়া ভিড় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে
বাংলাদেশের শাস্ত্রীয় নৃত্যচর্চা, ঐতিহ্য ও নন্দনচেতনার বিকাশকে কেন্দ্র করে সাংস্কৃতিক সংগঠন ভৈরবীর আয়োজনে অনুষ্ঠিত হলো শাস্ত্রীয় নৃত্য উৎসব “ধ্রুপদ”। রাজধানীর বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির স্টুডিও থিয়েটার হলে অনুষ্ঠিত এই আয়োজন সন্ধ্যা ৭টায় শুরু হওয়ার কথা থাকলেও অনুষ্ঠান শুরুর প্রায় আধাঘণ্টা আগেই মিলনায়তনের বাইরে দর্শকদের ব্যাপক সমাগম লক্ষ্য করা যায়।
নৃত্যপ্রেমী দর্শকদের উপস্থিতিতে অডিটোরিয়ামটি কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে ওঠে। এমনকি অনেক দর্শক পুরো অনুষ্ঠান দাঁড়িয়ে উপভোগ করেন। শাস্ত্রীয় নৃত্যের প্রতি দর্শকদের এমন আগ্রহ ও ভালোবাসা আয়োজকদেরও অভিভূত করে।
২৭ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দের গোধূলিলগ্নে আয়োজিত এই উৎসবে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের শিল্পীরা ভরতনাট্যম, মণিপুরী, কথক, ওড়িসি ও কথাকলি নৃত্যের মনোমুগ্ধকর পরিবেশনা উপস্থাপন করেন। ঐতিহ্য, শাস্ত্র, দেহভাষা, সুর ও ভাবপ্রকাশের এক অনন্য সম্মিলনে “ধ্রুপদ” রূপ নেয় এক নান্দনিক সাংস্কৃতিক মিলনমেলায়।

অনুষ্ঠানের উদ্বোধনী ও স্বাগত বক্তব্য প্রদান করেন ভৈরবীর প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক ইলিয়াস নবী ফয়সাল। তিনি বলেন—
“শাস্ত্রীয় নৃত্য কেবল একটি শিল্পমাধ্যম নয়; এটি মানুষের ভাব, দর্শন, শরীরী ভাষা এবং আধ্যাত্মিক চেতনার বহিঃপ্রকাশ। ‘ধ্রুপদ’-এর মাধ্যমে আমরা এমন একটি সাংস্কৃতিক পরিসর তৈরি করতে চাই, যেখানে নতুন প্রজন্ম শাস্ত্রীয় নৃত্যের গভীরতা ও সৌন্দর্যের সঙ্গে পরিচিত হতে পারে।”
তিনি আরও বলেন—
“বাংলাদেশে শাস্ত্রীয় নৃত্যের দর্শক, শিল্পী ও গবেষকদের মধ্যে একটি আন্তঃসংযোগ তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি। ‘ধ্রুপদ’ সেই সাংস্কৃতিক সংলাপের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রয়াস।”
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিশিষ্ট নৃত্যশিল্পী ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সোমা মুমতাজ, ট্যাগোর ইউনিভার্সিটি অফ ক্রিয়েটিভ আর্টস-এর রিসোর্স পার্সন ও কথক নৃত্য সম্প্রদায়ের পরিচালক সাজু আহমেদ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃত্যকলা বিভাগের চেয়ারপার্সন তামান্না রহমান।
অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে তামান্না রহমান বলেন—
“আমি এই আয়োজনে এসে সত্যিই আনন্দিত। আমি জানি না ফয়সাল কীভাবে একা এত বড় একটি আয়োজন করেছে। এত সুন্দর ও সুসংগঠিত আয়োজন দেখে আমি মুগ্ধ। আমি চাই, ভবিষ্যতেও প্রতি বছর এই আয়োজন হোক, এবং আমি প্রতিবারই এর সঙ্গে থাকতে চাই।”

একজন দর্শক অনুভূতি প্রকাশ করে বলেন—
“এত সুন্দর ও পরিপাটি শাস্ত্রীয় নৃত্য উৎসব অনেকদিন পর দেখলাম। ভৈরবীর এই উদ্যোগ সত্যিই প্রশংসার দাবিদার। আমরা চাই এই আয়োজন নিয়মিত চলমান থাকুক।”
উৎসবের শুরুতেই মঞ্চে পরিবেশিত হয় মণিপুরী শাস্ত্রীয় নৃত্যের অনন্য ধারা “পুং চোলম”। শিল্পী অর্ণব শর্মা পুং (মৃদঙ্গ) বাদনের সঙ্গে দেহভঙ্গি, ঘূর্ণন ও তালের শক্তিশালী সমন্বয়ে দর্শকদের মুগ্ধ করেন। নৃত্যরচনা করেন থিংগম ব্রোজেন কুমার সিংহ । লাইভ মিউজিকের মাধ্যমে পরিবেশনাটি আরও প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে।
এরপর ভরতনাট্যম নৃত্যদল ঊষান পরিবেশন করে “তোড়িয়াম”। আসমাউল হুসনা মাশিয়াত, প্রত্যাশা বসাক, অরিত্রী রহমান বর্ষা এবং সুবহা বিনতে সোবহান সম্মিলিতভাবে এই পরিবেশনায় অংশ নেন। নৃত্য নির্মাণ করেন থাঙ্কুমুনি কুট্টি এবং পুনর্নির্মাণ করেন প্রিয়াংকা সরকার। রাগমল্লিকা ও আদি তালের সমন্বয়ে পরিবেশিত এই নৃত্যটি ছিল অনুষ্ঠানের এক পবিত্র সূচনা।
কথক নৃত্য পরিবেশনা নিয়ে মঞ্চে আসে টিম প্রজন্ম। তারা পরিবেশন করে “বন্ধিশ- আয়ো শাবান” এবং “রবি শঙ্কর তারানা”। নিশিগন্ধা দাশ গুপ্তা, হাফসা আলম স্নাতা, যোহানা সূচনা দাস ও আবু ইবনে রাফি প্রাণবন্ত ছন্দ ও সূক্ষ্ম পদচারণার মাধ্যমে দর্শকদের মুগ্ধ করেন। নৃত্য নির্মাণ করেন মোহাম্মদ হানিফ।
এরপর নিবেদিতা দাস পরিবেশন করেন ভরতনাট্যমের “বসন্ত তিল্লানা”। দ্রুত লয়, প্রাণবন্ত পদচারণা এবং শুদ্ধ নৃত্যভঙ্গির মাধ্যমে তিনি বসন্তের উচ্ছ্বাস ও সৌন্দর্য ফুটিয়ে তোলেন। নৃত্যরচনা করেন গুরু খগেন্দ্র নাথ বর্মন।
মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলা থেকে আগত ‘চাউবা মেমোরিয়াল মণিপুরি ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি মিউজিয়াম’ পরিবেশন করে “মাইবি জাগোই”। নিংথৌজম মিথিলা চনু, নাউশেকপম জয়িতা সিনহা এবং লুকরাম রশনী সিনহা কোমল ও প্রতীকধর্মী ভঙ্গিমায় মণিপুরী আধ্যাত্মিক নৃত্যের ঐতিহ্য তুলে ধরেন। পেনা বাজান নিংথৌজম শুভদীপ সিংহ এবং ধুলবে ছিলেন লুকরাম আদি সিংহ।
ওড়িসি নৃত্যে তজিম চাকমা পরিবেশন করেন “বসন্ত পল্লবী”। পদ্মবিভূষণ গুরু কেলুচরণ মহাপাত্রের নৃত্য পরিকল্পনায় নির্মিত এই পরিবেশনাটি ছিল রাগ বসন্ত ও একতালি তালের অপূর্ব সমন্বয়।
ভরতনাট্যম নৃত্যে অন্তরা আক্তার পরিবেশন করেন “দেবী শব্দম”। দেবী পার্বতী, কালী, সরস্বতী ও লক্ষ্মীর বিভিন্ন রূপকে কেন্দ্র করে নির্মিত এই পরিবেশনায় ভাবপ্রকাশ ও ছন্দময় নৃত্যভঙ্গির সমন্বয় দর্শকদের আবেগাপ্লুত করে। নৃত্য পরিচালনা করেন রঞ্জিত বাবু।

এরপর কথক নৃত্যশিল্পী মন্দিরা চৌধুরী পরিবেশন করেন “শিবস্তুতি” এবং শুদ্ধ নৃত্য। ত্রিতাল ও ধামার তালের উপর ভিত্তি করে নির্মিত এই পরিবেশনায় শিবতত্ত্বের গাম্ভীর্য ও শক্তির প্রকাশ ঘটে। নৃত্য নির্মাণ করেন ড. সুচরিতা দত্ত ঘাটা।
প্রান্তিক দেব পরিবেশন করেন ভরতনাট্যমের “অম্বা স্তুতি”। রাজরাজেশ্বরী দেবীর বন্দনাভিত্তিক এই পরিবেশনায় ভক্তি, সৌন্দর্য ও আধ্যাত্মিকতার এক মেলবন্ধন ফুটে ওঠে। নৃত্য নির্মাণ ও পরিবেশনায় ছিলেন প্রান্তিক দেব নিজেই।
মণিপুরী নৃত্যে মিথিলা চনু পরিবেশন করেন “ব্রহ্মতাল প্রবন্ধ”। শ্রীকৃষ্ণের তাণ্ডবভিত্তিক এই নৃত্যাংশে শক্তিশালী দেহভঙ্গি, তীব্র লয় ও ঐশ্বরিক ভাবপ্রকাশ বিশেষভাবে দর্শকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। নৃত্য নির্মাণ করেন গুরু বিপিন সিংহ।
কথাকলি পরিবেশনা নিয়ে মঞ্চে আসেন রোমন ইসলাম প্রীতম। তিনি “দুর্যোধন বধ” পদ-এর অংশবিশেষ পরিবেশন করেন। দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণ ও শ্রীকৃষ্ণের রৌদ্ররসকে কেন্দ্র করে নির্মিত এই পরিবেশনায় কথাকলির অভিনয়ভঙ্গি ও রসতাত্ত্বিক গভীরতা দর্শকদের বিমোহিত করে। নৃত্য নির্মাণ করেন গুরু কলামণ্ডলম ভেঙ্কিট।
এরপর ভরতনাট্যম পরিবেশন করেন মারিয়া ফারিহ উপামা। তাঁর পরিবেশনায় ছিল শুদ্ধ নৃত্যভঙ্গি, সুষম দেহরেখা ও নান্দনিক অভিব্যক্তির সুন্দর সমন্বয়।
কথক নৃত্যে সোনিয়া পারভীন পরিবেশন করেন “তারানা”। রাগ বাসন্ত ও ত্রিতালের উপর নির্মিত এই পরিবেশনায় দ্রুত পদচারণা ও ছন্দের গতি বিশেষভাবে দর্শকদের মুগ্ধ করে। নির্মাণ করেন মনিরা পারভীন।
অপর্না নিশি পরিবেশন করেন মণিপুরী নৃত্য “রাধা রূপ বর্ণন”। লাস্যময় এই পরিবেশনায় শ্রীরাধার সৌন্দর্য, কোমলতা ও শৃঙ্গার রস অত্যন্ত সুকুমারভাবে ফুটে ওঠে। নৃত্য নির্মাণ করেন গুরু কলাবতী দেবী।
ওড়িসি নৃত্যে মোঃ জসিম উদ্দীন পরিবেশন করেন “বসন্ত পল্লবী”। রাগ বসন্ত ও একতালির সমন্বয়ে নির্মিত এই পরিবেশনায় ওড়িসি নৃত্যের শুদ্ধ দেহভাষা ও ছন্দের সৌন্দর্য ফুটে ওঠে। নৃত্য পরিকল্পনা করেন গুরু কেলুচরণ মহাপাত্র।
অনুষ্ঠানের সর্বশেষ পরিবেশনা নিয়ে মঞ্চে আসেন প্রিয়াংকা সরকার। তিনি প্রথমে পরিবেশন করেন “পুষ্পাঞ্জলি”, যা ভরতনাট্যমের একটি ঐতিহ্যবাহী আবাহনমূলক নৃত্য। এরপর তিনি পরিবেশন করেন “কীর্তনাম”, যেখানে ভক্তি, অভিনয় এবং জটিল পদচারণার এক অপূর্ব সমন্বয় দেখা যায়।
এছাড়াও নৃত্যম নৃত্যশীলন কেন্দ্র পরিবেশন করে মণিপুরী নৃত্য “রাধা অভিসার”। গুরু বিপিন সিংহের নৃত্যরচনায় এবং তামান্না রহমানের নৃত্য পরিচালনায় পরিবেশিত এই নৃত্যে অংশ নেন ফারহানা করিন তন্দ্রা এবং প্রমা বিশ্বাস। শ্রীরাধার প্রেম, অপেক্ষা ও অভিসারের অনুভূতি অত্যন্ত নান্দনিকভাবে উপস্থাপিত হয় এই পরিবেশনায়।
অনুষ্ঠানের শেষ পর্বে অতিথিবৃন্দ শিল্পীদের হাতে সম্মাননা ক্রেস্ট, উত্তরীয় ও শুভেচ্ছা স্মারক তুলে দেন।
এই আয়োজনের টাইটেল পার্টনার ছিল ওয়েলেশিয়া। সহযোগিতায় ছিল জেসিআই ঢাকা ইয়ং, ধারা এবং শেষচিত্র।
ভৈরবী সম্পর্কে বলতে গিয়ে আয়োজকরা জানান, ভৈরবী একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন, যা সংগীত, নৃত্য, নাট্য ও লোকঐতিহ্যভিত্তিক শিল্পচর্চার মাধ্যমে নতুন প্রজন্মকে শিল্প-সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত করার লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে। শাস্ত্রীয় শিল্পচর্চার পাশাপাশি গবেষণা, প্রশিক্ষণ ও সাংস্কৃতিক সংলাপ তৈরিতেও সংগঠনটি সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে।
আপনার মতামত লিখুন :