আস্থার সংকট ও প্রশাসক জটিলতা: ধামরাইয়ে ঝিমিয়ে পড়েছে গ্রাম আদালত


​বিশেষ প্রতিবেদক, ধামরাই প্রকাশের সময় : মে ১৭, ২০২৬, ৪:৩২ অপরাহ্ন

আইনগত জটিলতা, প্রশাসকদের অনিয়মিত উপস্থিতি এবং নানামুখী প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতায় ঢাকা জেলার ধামরাই উপজেলার ইউনিয়ন পরিষদগুলোতে স্থবির হয়ে পড়েছে গ্রাম আদালতের কার্যক্রম। যেখানে গ্রামের প্রান্তিক মানুষের ছোটখাটো বিরোধ নিষ্পত্তির মূল ভরসা হওয়ার কথা ছিল এই আদালতের, সেখানে গত পাঁচ মাসে উপজেলার অধিকাংশ ইউনিয়নে মামলা হয়েছে মাত্র ৩টি। ফলে ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন সাধারণ মানুষ, আর সাধারণ জনগণের মাঝে দিন দিন হ্রাস পাচ্ছে এই আদালতের গ্রহণযোগ্যতা।

স্থবিরতার নেপথ্যে ‘প্রশাসক’ সংকট ও অনিয়মিত উপস্থিতি:
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ধামরাই উপজেলার ১৬টি ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভার মধ্যে বর্তমানে মাত্র ৩টি ইউনিয়নে নির্বাচিত চেয়ারম্যান এবং ১টিতে প্যানেল চেয়ারম্যান দায়িত্ব পালন করছেন। বাকি ১২টি ইউনিয়ন পরিষদই চলছে সরকারি প্রশাসকদের মাধ্যমে।
​অভিযোগ রয়েছে, অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে নিয়োজিত এই প্রশাসকদের অধিকাংশেরই সপ্তাহে মাত্র একদিন সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদে বসার সুযোগ হয়। ফলে দূর-দূরান্ত থেকে আসা বিচারপ্রার্থীরা এসে তাদের পাচ্ছেন না। এতে করে চরম আস্থার সংকটে ভুগছেন সাধারণ মানুষ এবং এক প্রকার বাধ্য হয়েই তারা গ্রাম আদালত থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন।


​ধামরাই উপজেলা গ্রাম আদালত কো-অর্ডিনেটর জসীম উদ্দীন এই সংকটের সত্যতা স্বীকার করে জানান:
​”অধিকাংশ ইউনিয়ন পরিষদে নির্বাচিত প্রতিনিধি না থাকায় এবং প্রশাসকদের ওপর জনগণের আস্থার অভাব তৈরি হওয়ায় সাধারণ মানুষ এখন গ্রাম আদালত বিমুখ হয়ে পড়ছে।”

​মেম্বার প্রতিনিধিদের নিষ্ক্রিয়তা ও প্রশাসনিক জটিলতা: ​
নিয়ম অনুযায়ী, প্রতিটা ইউনিয়ন পরিষদে গ্রাম আদালতের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য একজন মেম্বার (ইউপি সদস্য) প্রতিনিধিকে নির্দিষ্ট করা থাকে। কিন্তু বর্তমানে নানামুখী প্রশাসনিক জটিলতা এবং নির্বাচিত চেয়ারম্যানদের অনুপস্থিতির কারণে এই প্রতিনিধিরাও স্বাধীনভাবে বা নিয়মিত কাজ করতে পারছেন না। ফলে তৃণমূল পর্যায়ে আদালতের প্রাথমিক প্রক্রিয়াগুলোই থমকে গেছে।

​লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক পিছিয়ে মামলার হার:
​বিগত পাঁচ মাসের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, আদর্শ নিয়ম অনুযায়ী প্রতিটি ইউনিয়ন পরিষদের গ্রাম আদালতে প্রতি মাসে কমপক্ষে ৫টি মামলা গ্রহণ এবং অন্তত ৪টি মামলা নিষ্পত্তি হওয়ার কথা। কিন্তু ধামরাইয়ের বাস্তবতা সম্পূর্ণ বিপরীত। প্রশাসকদের অনিয়মিত উপস্থিতি ও জনগণের অনাস্থার কারণে গত পাঁচ মাসে উপজেলার অধিকাংশ ইউনিয়নে গড়ে মামলা হয়েছে মাত্র ৩টি, যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অত্যন্ত হতাশাজনক।

​গতিশীল করতে চলছে প্রশিক্ষণ ও সরকারি তৎপরতা:
​পরিস্থিতি উত্তরণে অবশ্য হাল ছাড়ছে না জেলা প্রশাসন। গ্রাম আদালতের কার্যক্রমকে আবারও সচল ও গতিশীল করতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে। ঢাকা জেলা গ্রাম আদালতের জিএম আল ফারুক গাজী জানান:​”গুরুত্বপূর্ণ এই গ্রাম আদালতের কার্যক্রমকে গতিশীল করতে আমরা ব্যাপক প্রচার-প্রসার, সভা ও সেমিনারের আয়োজন করছি। এছাড়া গ্রাম আদালতের সাথে সরাসরি জড়িত কর্মকর্তা ও প্রতিনিধিদের বিভিন্ন পর্যায়ে পেশাগত প্রশিক্ষণ দেওয়া চলমান রয়েছে।”
​অন্যদিকে, ধামরাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আল মামুন পরিষদের কাজ সচল রাখার বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন:​”দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রশাসকরা তাদের মূল দাপ্তরিক কর্মকাণ্ড শেষ করেও পরিষদের কাজগুলো যথাযথভাবে সচল রাখার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। বিশেষ করে গ্রাম আদালতের কার্যক্রমকে আরও গতিশীল ও জনমুখী করতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে।”

​স্থানীয়দের প্রত্যাশা:
​সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, গ্রামীণ জনপদের সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় আইনি সেবা পৌঁছে দিতে গ্রাম আদালতের কোনো বিকল্প নেই। তবে ধামরাইয়ে এই আদালতের প্রতি মানুষের হারিয়ে যাওয়া আস্থা ফিরিয়ে আনতে প্রশাসকদের উপস্থিতি আরও নিয়মিত করা এবং দ্রুত প্রশাসনিক জটিলতা দূর করা জরুরি।