ছাত্র-জনতার ব্যাপক বিক্ষোভের মুখে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে শেখ হাসিনা পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন। তার দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নিয়েছে।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করতে চাইছে আওয়ামী লীগের প্রধান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বিএনপি। তাকে ফেরত পাঠাতে এরই মধ্যে নয়া দিল্লির প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
তবে ড. মুহাম্মদ ইউনূস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের পক্ষ থেকে এখনও আনুষ্ঠানিক কোনও বক্তব্য আসেনি এই বিষয়ে।
পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ থেকে যদি শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর জোর দাবি ওঠে, তাহলে নয়া দিল্লি কী করতে পারে- সেই প্রশ্ন উঠেছে।
বন্দি প্রত্যার্পণে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে চুক্তি রয়েছে। শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী থাকার সময়ই ২০১৩ সালে চুক্তিটি হয়। ২০১৬ সালে সেটি সংশোধনও হয়েছিল।
সেই চুক্তিতে শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠিয়ে বিচারের মুখোমুখি করার সুযোগ রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখে ভারতের সংবাদমাধ্যম ফার্স্টপোস্টে লিখেছেন প্রভাস কে দত্ত।
উত্তর-পূর্ব ভারতে বিদ্রোহ মোকাবেলায় ঢাকা ও নয়াদিল্লির মধ্যে প্রত্যার্পণ চুক্তিটি হয়েছিল। এই চুক্তির সুবিধা ভারত-বাংলাদেশ উভয়ই পেয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ ও আসামে আত্মগোপনে থাকা জামাত-উল-মুজাহিদিন বাংলাদেশের (জেএমবি) সদস্যদের গ্রেপ্তার করে ফেরানো হয় ওই চুক্তির অধীনে।
আর ভারতও ওই চুক্তির অধীনেই ইউনাইটেড লিবারেশন ফ্রন্ট অব আসামের (উলফা) নেতা অনুপ চেটিয়াকে ২০১৫ সালে বাংলাদেশ থেকে নিয়ে যেতে পেরেছিল। ভারতও এই চুক্তির মাধ্যমে কয়েকজন বাংলাদেশি পলাতককে হস্তান্তর করেছে।
চুক্তিতে প্রত্যর্পণের শর্ত ও অপরাধের তালিকা রয়েছে। ভারত ও বাংলাদেশের ‘প্রত্যর্পণযোগ্য অপরাধ’ হিসাবে চুক্তিতে তালিকাভুক্ত অপরাধের জন্য ‘যাদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে’ বা ‘যাদের অভিযুক্ত করা হয়েছে বা দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে বা তাদের জন্য ওয়ান্টেড’ পলাতকদের প্রত্যর্পণ করার কথা।
এক বছর বা তার বেশি মেয়াদের কারাদণ্ডযোগ্য অপরাধই অর্থাৎ আর্থিক অনিয়মসহ অন্যান্য সংশ্লিষ্ট অপরাধগুলোই প্রত্যর্পণযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে।
ভারত-বাংলাদেশ প্রত্যর্পণ চুক্তির সফল বাস্তবায়নে দ্বৈত অপরাধের নীতিটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি দিক, যা তুলে ধরেছেন প্রভাস দত্ত। অর্থাৎ, কোনও অপরাধকে যাতে প্রত্যর্পণযোগ্য হিসেবে বিবেচনা করা যায়, তার জন্য ওই অপরাধটি উভয় দেশেই দণ্ডনীয় হতে হবে।
চুক্তির ধারা ৭ এ প্রত্যর্পণযোগ্য অপরাধ কী এবং উভয় দেশের কর্তৃপক্ষ প্রত্যর্পণের অনুরোধের জবাবে কীভাবে সাড়া দেবে সে সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করে।
কিন্তু কিছু ব্যতিক্রম আছে। যেসব অপরাধ ‘রাজনৈতিক প্রকৃতির’ তাদের ক্ষেত্রে এই চুক্তি প্রযোজ্য হবে না।
চুক্তির ষষ্ঠ ধারায় রাজনৈতিক অপরাধের একটি তালিকা উল্লেখ করা হয়েছে, যা এই চুক্তির ব্যতিক্রম।
চুক্তির অষ্টম ধারায় আরও কিছু ব্যতিক্রম উল্লেখ করা হয়েছে, যার আলোকে ভারত ও বাংলাদেশ উভয় দেশই নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে প্রত্যর্পণের অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করতে পারবে।
যদি কোনও প্রত্যর্পণের অনুরোধ ‘বিশ্বাসযোগ্য না হয়’ এবং ‘ন্যায়বিচারের স্বার্থে’ নয় বলে বিবেচিত হয়, সেক্ষেত্রে তা প্রত্যাখ্যান করা যেতে পারে।
গত ৫ অগাস্ট গণভবন থেকে হেলিকপ্টারে সরিয়ে নেওয়া হয় শেখ হাসিনাকে। পরে তিনি যান ভারতে।
চুক্তির অষ্টম ধারা অনুযায়ী, যদি কোনও ব্যক্তি প্রত্যর্পণকারী দেশকে সন্তুষ্ট করতে পারে যে তার বিরুদ্ধে যে অপরাধের অভিযোগ আছে অথবা যে অপরাধের জন্য তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে, তা খুবই তুচ্ছ প্রকৃতির, তাহলে প্রত্যর্পণের অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করা যেতে পারে।
অথবা তাকে প্রমাণ করতে হবে যে তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগটি ন্যায়বিচারের স্বার্থে করা হয়নি। যে অপরাধের জন্য তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে অথবা যে অপরাধে তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে, তা একটি সামরিক অপরাধ এবং সাধারণ অপরাধ আইনের অধীনে দণ্ডনীয় কোনও অপরাধ নয়।
এছাড়া যদি কোনও ব্যক্তির বিরুদ্ধে অনুরোধকারী দেশে কোনও ফৌজদারি মামলা চলমান থাকে অথবা সেখানে তাকে কোনও অপরাধের জন্য দোষী সাব্যস্ত করা হয়, তাহলে প্রত্যর্পণের অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করা যেতে পারে।
ভারত কি হাসিনার প্রত্যর্পণের অনুরোধ অস্বীকার করতে পারে?
প্রভাস দত্ত লিখেছেন, শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর মধ্যে হত্যা, অপরাধমূলক মানবহত্যা, আক্রমণ, বিস্ফোরণ ঘটানো, জীবন বিপন্ন করার উদ্দেশ্যে বিস্ফোরক পদার্থ বা অস্ত্র তৈরি করা বা রাখা, গ্রেপ্তার এড়ানোর জন্য আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করা, জীবন বিপন্ন করার উদ্দেশ্যে সম্পত্তি ক্ষতিগ্রস্ত করা, অপহরণ বা জিম্মি করা, হত্যার উস্কানি এবং সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে সম্পর্কিত অপরাধ অন্তর্ভুক্ত।
এই অপরাধগুলো রাজনৈতিক প্রকৃতির অপরাধগুলোর মধ্যে ব্যতিক্রমের আওতায় পড়ে না। সুতরাং, একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হওয়া সত্ত্বেও শেখ হাসিনার মামলা এই ব্যতিক্রমের আওতায় নাও আসতে পারে।
এছাড়া এগুলো তুচ্ছ অভিযোগ নয় বা ধারা ৮ চালু করার মতো সময় অতিবাহিত হয়নি।
তবে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে করা অভিযোগগুলোকে ভারত যদি ‘সৎ উদ্দেশে নয়’ এবং ‘ন্যায়বিচারের স্বার্থে নয়’ বিবেচনা করে, সেক্ষেত্রে ধারা ৮ এর আওতায় প্রত্যর্পণের অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করতে পারে।
তবে এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক প্রশ্নটি, বলছেন প্রভাস দত্ত।
তার ভাষ্যে, কারণ বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন ভারতের একজন বিশ্বস্ত বন্ধু ছিলেন শেখ হাসিনা। ভারতের প্রতি তার বন্ধুত্বপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি নয়াদিল্লির জন্য কৌশলগত গুরুত্ব বহন করে।
“কিন্তু এটি ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ককে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। কারণ বঙ্গোপসাগরকে ঘিরে থাকা দেশটি দ্রুত চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের খেলার মাঠ হয়ে উঠছে। এক্ষেত্রে ভারত ইউনূস সরকারকে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের জন্য আনুষ্ঠানিক অনুরোধ করা থেকে নিরুৎসাহিত করতে একটি কূটনৈতিক পথ বেছে নিতে পারে।”
আপনার মতামত লিখুন :