যুক্তরাষ্ট্রের মোকাবিলায় চীনের মরুভূমিতে বিশাল পরমাণু অবকাঠামো, উদ্বিগ্ন নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা


দৈনিক বাংলার মুখ ডেস্ক প্রকাশের সময় : মে ৩১, ২০২৬, ১১:১৫ অপরাহ্ন

চীনের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের প্রত্যন্ত মরুভূমিতে দ্রুতগতিতে গড়ে ওঠা বিশাল সামরিক অবকাঠামো আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের নতুন করে ভাবিয়ে তুলেছে। স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, দেশটি পারমাণবিক অস্ত্রভান্ডার সুরক্ষিত রাখা এবং সম্ভাব্য মার্কিন আগাম হামলার পরও কার্যকর পাল্টা আঘাত হানার সক্ষমতা জোরদার করতে ব্যাপক প্রস্তুতি নিচ্ছে।

নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, সাম্প্রতিক এই নির্মাণকাজ শুধু নতুন ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটি তৈরির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি চীনের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত প্রতিরোধক্ষমতা বৃদ্ধির একটি সুসংগঠিত কর্মসূচির অংশ।

মরুভূমিতে গড়ে উঠছে বিস্তৃত সামরিক নেটওয়ার্ক

বার্তাসংস্থা রয়টার্সের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, জিনজিয়াং অঞ্চলের হামি পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটির আশপাশে ৮০টিরও বেশি উৎক্ষেপণ কেন্দ্র, একাধিক সুরক্ষিত বাংকার এবং অষ্টভুজাকৃতির বৃহৎ সামরিক স্থাপনা নির্মাণ করেছে চীন।

শাটল রাডার টপোগ্রাফি মিশন, ন্যাচারাল আর্থ ও ওপেনস্ট্রিটম্যাপ।

বিশ্লেষকদের ধারণা, এসব স্থাপনা থেকে ভ্রাম্যমাণ আন্তমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র পরিচালনা, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ এবং সামরিক যোগাযোগ কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব হবে।

স্যাটেলাইট চিত্রে আরও দেখা গেছে, বিস্তীর্ণ মরুভূমিজুড়ে নতুন সড়ক, ভূগর্ভস্থ সংযোগপথ, রেলপথ, বিমানঘাঁটি এবং যোগাযোগ অবকাঠামো গড়ে তোলা হয়েছে, যা একটি সমন্বিত প্রতিরক্ষা নেটওয়ার্কের ইঙ্গিত দেয়।

শাটল রাডার টপোগ্রাফি মিশন, ন্যাচারাল আর্থ ও ওপেনস্ট্রিটম্যাপ।


পাল্টা আঘাত হানার সক্ষমতা শক্তিশালী করার কৌশল

বিশেষজ্ঞদের মতে, চীনের সামরিক পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হলো তথাকথিত “দ্বিতীয় আঘাত” বা সেকেন্ড-স্ট্রাইক সক্ষমতা নিশ্চিত করা। অর্থাৎ, শত্রুপক্ষ আগে পারমাণবিক হামলা চালালেও যাতে চীন তার অবশিষ্ট সক্ষমতা ব্যবহার করে কার্যকর পাল্টা জবাব দিতে পারে।

হাওয়াইভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান প্যাসিফিক ফোরামের গবেষক আলেকজান্ডার নিলের ভাষায়, মরুভূমির হাজার হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে যে অবকাঠামো তৈরি হচ্ছে, তা চীনের কৌশলগত প্রতিরোধব্যবস্থাকে আগের তুলনায় অনেক বেশি শক্তিশালী ও বহুমাত্রিক করে তুলছে।

শাটল রাডার টপোগ্রাফি মিশন, ন্যাচারাল আর্থ ও ওপেনস্ট্রিটম্যাপ।

যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রতিযোগিতার নতুন অধ্যায়

তাইওয়ান ইস্যু, প্রযুক্তি প্রতিযোগিতা এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ওয়াশিংটন ও বেইজিংয়ের সম্পর্ক ক্রমেই উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

এই প্রেক্ষাপটে চীনের পারমাণবিক সক্ষমতা বৃদ্ধির পদক্ষেপকে অনেক বিশ্লেষক বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার অংশ হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, বেইজিং এখন শুধু প্রতিরক্ষামূলক অবস্থানে সীমাবদ্ধ নেই; বরং দীর্ঘমেয়াদে পারমাণবিক ভারসাম্যে আরও শক্তিশালী অবস্থান নিশ্চিত করতে চায়।

স্বচ্ছতার অভাব নিয়ে পশ্চিমা উদ্বেগ

চীনের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পর্কে তথ্য প্রকাশের সীমাবদ্ধতা নিয়ে পশ্চিমা দেশগুলো দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে। যুক্তরাষ্ট্র একাধিকবার বেইজিংয়ের সঙ্গে কৌশলগত স্থিতিশীলতা এবং পারমাণবিক নীতি নিয়ে সংলাপের চেষ্টা করলেও তা উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি পায়নি।

চীনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় নতুন অবকাঠামো কিংবা স্যাটেলাইট চিত্রে ধরা পড়া সামরিক স্থাপনাগুলোর বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো মন্তব্য করেনি। অন্যদিকে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরও গোয়েন্দা তথ্যের বিষয়ে প্রকাশ্যে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।

অষ্টভুজাকৃতির রহস্যময় স্থাপনা

বিশ্লেষকদের বিশেষ দৃষ্টি কেড়েছে মরুভূমিতে নির্মিত তিনটি অষ্টভুজাকৃতির স্থাপনা। এসব কেন্দ্রের চারপাশে সামরিক যান চলাচল, সুরক্ষিত অস্ত্রভান্ডার, যোগাযোগ টাওয়ার এবং সম্ভাব্য ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ সুবিধার উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে।

বিশেষজ্ঞদের ধারণা, এগুলো কমান্ড, নিয়ন্ত্রণ ও যোগাযোগ ব্যবস্থার কেন্দ্র হতে পারে, যা পারমাণবিক বাহিনীর কার্যক্রম সমন্বয় এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

পারমাণবিক শক্তি বৃদ্ধির পথে চীন

মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের সাম্প্রতিক মূল্যায়ন অনুযায়ী, বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় দ্রুতগতিতে নিজেদের পারমাণবিক সক্ষমতা সম্প্রসারণ করছে চীন। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০৩০ সালের মধ্যে দেশটি প্রায় এক হাজার পারমাণবিক ওয়ারহেড মোতায়েনের সক্ষমতা অর্জনের পথে রয়েছে।

একই সঙ্গে আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা, স্যাটেলাইটভিত্তিক নজরদারি এবং ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা অবকাঠামোও শক্তিশালী করা হচ্ছে, যা সম্ভাব্য আক্রমণের বিরুদ্ধে দ্রুত প্রতিক্রিয়া নিশ্চিত করতে সহায়তা করবে।

চীনের এই নির্মাণযজ্ঞ কেবল নতুন সামরিক ঘাঁটি তৈরির বিষয় নয়; বরং এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত বিনিয়োগ, যার লক্ষ্য পারমাণবিক প্রতিরোধক্ষমতাকে আরও নির্ভরযোগ্য ও টেকসই করা।

পারমাণবিক অস্ত্র বিশ্লেষক হ্যান্স ক্রিস্টেনসেন বলেন, মরুভূমির প্রতিকূল পরিবেশে এত বড় পরিসরে সামরিক অবকাঠামো নির্মাণ সাম্প্রতিক ইতিহাসে খুব কমই দেখা গেছে। তার ভাষায়, এটি “অসাধারণ এবং অভাবনীয়” একটি উদ্যোগ।

চীনের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের মরুভূমিতে গড়ে ওঠা এই বিস্তৃত সামরিক নেটওয়ার্ক ইঙ্গিত দিচ্ছে যে দেশটি ভবিষ্যতের সম্ভাব্য কৌশলগত সংঘাতের জন্য নিজেদের প্রস্তুতি আরও জোরদার করছে। তবে প্রকল্পগুলোর প্রকৃত উদ্দেশ্য, সেখানে কী ধরনের অস্ত্র মোতায়েন করা হবে এবং এগুলো কতটা কার্যকর হবে—এসব প্রশ্নের অনেক উত্তর এখনো অজানা। তবু একটি বিষয় স্পষ্ট, বৈশ্বিক পারমাণবিক প্রতিযোগিতার নতুন অধ্যায়ে চীন তার অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।