টাকা তোলার হিড়িক

সংকট সামলাতে ইসলামী ব্যাংককে আড়াই হাজার কোটি টাকা দিল বাংলাদেশ ব্যাংক


বাংলার মুখ প্রতিবেদক প্রকাশের সময় : জুন ১৪, ২০২৬, ৪:২৮ অপরাহ্ন

চেয়ারম্যান নিয়োগকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট আস্থাহীনতার কারণে ব্যাপক আমানত প্রত্যাহারের মুখে বড় ধরনের তারল্য সংকটে পড়েছে দেশের বৃহত্তম বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি। উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলায় ব্যাংকটিকে আড়াই হাজার কোটি টাকার জরুরি সহায়তা দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

রোববার (১৪ জুন) বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. আরিফ হোসেন খান বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, সহায়তার মোট অর্থের মধ্যে ২ হাজার কোটি টাকা নগদ তারল্য সহায়তা হিসেবে দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি আন্তঃব্যাংক লেনদেনের গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম রিয়েল টাইম গ্রস সেটেলমেন্ট (আরটিজিএস) সেবা সচল রাখতে অতিরিক্ত ৫০০ কোটি টাকা সরবরাহ করা হয়েছে।

এক সপ্তাহে উত্তোলন প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা

সম্প্রতি ইসলামী ব্যাংকের শীর্ষ নেতৃত্বে পরিবর্তনের পর গ্রাহকদের মধ্যে উদ্বেগ ও আস্থাহীনতা তৈরি হয়। নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর মো. খুরশীদ আলমের নিয়োগের পর থেকেই ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারী, শেয়ারহোল্ডার ও গ্রাহকদের একটি অংশ অসন্তোষ প্রকাশ করে আসছে।

এর প্রভাব সরাসরি পড়ে আমানত ব্যবস্থাপনায়। গত এক সপ্তাহে গ্রাহকরা ব্যাংকটি থেকে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা উত্তোলন করেছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। ফলে ব্যাংকটির তারল্য ব্যবস্থাপনায় চাপ তৈরি হয় এবং দৈনন্দিন লেনদেন পরিচালনায় জটিলতা দেখা দেয়।

সিআরআর কমে নেমেছে ২ হাজার ৬০০ কোটিতে

বাংলাদেশ ব্যাংকের বিধান অনুযায়ী ব্যাংকগুলোর একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ ক্যাশ রিজার্ভ রেশিও (সিআরআর) হিসেবে সংরক্ষণ করতে হয়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, চেয়ারম্যান পরিবর্তনের আগে ইসলামী ব্যাংকের সিআরআর উদ্বৃত্ত ছিল। যেখানে ব্যাংকটির সিআরআর প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকা থাকার কথা, সেখানে আমানত উত্তোলনের চাপের কারণে তা কমে বর্তমানে প্রায় ২ হাজার ৬০০ কোটি টাকায় নেমে এসেছে।

এছাড়া কেন্দ্রীয় ব্যাংকে সংরক্ষিত ব্যাংকটির চলতি হিসাবের (কারেন্ট অ্যাকাউন্ট) ব্যালেন্সও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে ১০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ তারল্য সহায়তা চেয়ে আবেদন করে ইসলামী ব্যাংক। তারই অংশ হিসেবে প্রাথমিক পর্যায়ে ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা সহায়তা দেওয়া হয়েছে।

কেন তৈরি হলো এই অস্থিরতা?

গত ২৪ মে ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান অধ্যাপক এম. জুবায়দুর রহমান পদত্যাগ করেন। একই দিনে নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ পান সাবেক ডেপুটি গভর্নর মো. খুরশীদ আলম। তবে এই নিয়োগের পর থেকেই ব্যাংকটির সামনে আন্দোলন ও প্রতিবাদের মুখোমুখি হতে হয়।

‘ইসলামী ব্যাংক সচেতন গ্রাহক ফোরাম’-এর ব্যানারে মতিঝিলে ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে টানা কর্মসূচি পালন করছেন আন্দোলনকারীরা। তাদের অভিযোগ, বিতর্কিত ব্যক্তিকে চেয়ারম্যান নিয়োগ দেওয়ার ফলে ব্যাংকের সংস্কার কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হতে পারে। দাবি পূরণ না হলে বাংলাদেশ ব্যাংক ঘেরাও কর্মসূচিরও ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের অবস্থান

এদিকে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটোত্তর সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান বলেন, ইসলামী ব্যাংকের কার্যক্রমে সরকার বা কেন্দ্রীয় ব্যাংক কোনো অবৈধ হস্তক্ষেপ করেনি।

তিনি জানান, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গঠিত পাঁচ সদস্যের বোর্ডের একজন সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠায় গত ১৬ মার্চ তাকে পরিবর্তন করা হয়। এর বাইরে কাউকে বদলি বা পদোন্নতির বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক কোনো নির্দেশনা দেয়নি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন গুঞ্জনেরও বাস্তব ভিত্তি নেই বলে মন্তব্য করেন তিনি।

পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে কেন্দ্রীয় ব্যাংক

ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতা রক্ষা এবং আমানতকারীদের স্বার্থ সুরক্ষায় বাংলাদেশ ব্যাংক পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ইসলামী ব্যাংকের মতো বৃহৎ আর্থিক প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা পুরো ব্যাংকিং খাতের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। তাই আস্থা পুনরুদ্ধার এবং স্বাভাবিক কার্যক্রম নিশ্চিত করা এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।