ফুটবলকে কেন ‘গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’ বলা হয়, তার নিখুঁত ও নিষ্ঠুরতম প্রমাণ মিলল সিয়াটলের মাঠে। যেখানে বীরত্ব, ট্র্যাজেডি, আর মহানাটকের সব উপাদান মিলেমিশে একাকার হয়ে গেল।
ম্যাচের শেষ বাঁশি বাজার পর মাঠের এক প্রান্তে মিশরের ফুটবলাররা যখন স্রষ্টার প্রতি কৃতজ্ঞতায় সিজদায় মগ্ন, ঠিক তখন অন্য প্রান্তে সবুজ ঘাসে মুখ লুকিয়ে কাঁদছেন ইরানি যোদ্ধারা। মাত্র কয়েক মিলিমিটারের ব্যবধানে ইতিহাস গড়া হলো না ইরানের। মিশরের সঙ্গে ১-১ গোলের ড্রয়ে নকআউটের স্বপ্ন এখন সুতোয় ঝুলছে তাদের।
ঘটনার ঘনঘটা:
প্রথম ১৫ মিনিটেই অগ্নিগর্ভ ম্যাচ
বাংলাদেশ সময় শনিবার সকালে শুরু হওয়া এই ম্যাচের প্রথম ১৫ মিনিটেই যা ঘটল, তা যেকোনো থ্রিলার সিনেমার চিত্রনাট্যকেও হার মানায়। ম্যাচের সময় তখন মাত্র ৫ মিনিট। গ্যালারিতে তখনো দর্শকদের আসন নেওয়ার রেশ কাটেনি। ঠিক তখনই মিশরের তুরুপের তাস মোহামেদ সালাহ ও মাহমুদ ত্রেজেগের দারুণ এক জুটিতে কেঁপে ওঠে ইরানের রক্ষণভাগ। সালাহর বাঁ পায়ের জোরালো শট ইরানি গোলকিপার আলিরেজা বেইরনভান্ড রুখে দিলেও বল গ্লাভসবন্দী করতে পারেননি। ওত পেতে থাকা মাহমুদ সবের আলিরেজার দুই পায়ের ফাঁক গলে বল জালে জড়িয়ে মিশরকে উল্লাসে ভাসান (১-০)।
পিছিয়ে পড়েও দমে যায়নি ইরান। আক্রমণের ধার বাড়িয়ে ম্যাচের ৯ম মিনিটেই পেনাল্টি আদায় করে নেয় তারা। মেহদি তারেমিকে বক্সে ফাউল করা হলে রেফারি পেনাল্টির বাঁশি বাজান। স্পট কিক নিতে আসেন ইরানের ইতিহাসের অন্যতম সেরা গোলদাতা তারেমি নিজেই। কিন্তু নাটকের তখনও বাকি! তারেমির শট ডানদিকে ঝাঁপিয়ে দুর্দান্তভাবে নসাৎ করে দেন মিশরীয় গোলরক্ষক মোস্তাফা শুবির।
পেনাল্টি মিসের সেই হতাশা অবশ্য বেশিক্ষণ স্থায়ী হতে দেয়নি ইরান। ঠিক তার পরের মিনিটেই (১০ম মিনিটে) মিলাদ মোহাম্মাদির একটি বাঁকানো জোরালো শট মিশরীয় গোলকিপার পাঞ্চ করে ফেরালেও সম্পূর্ণ বিপদমুক্ত করতে পারেননি। দূরূহ কোণ থেকে চতুর এক ট্যাপ-ইনে বল জালে জড়িয়ে ইরানকে সমতায় ফেরান রামিন রেজাইয়ান (১-১)। গ্যালারিতে তখন ইরানি সমর্থকদের গগণবিদারী চিৎকার।
সালাহ ম্যাজিক ও মধ্যমাঠের লড়াই
প্রথমার্ধের বাকিটা সময় জুড়ে ড্রিাবলিং আর গতির ঝড় তুলে ইরানি ডিফেন্ডারদের তটস্থ করে রাখেন মোহামেদ সালাহ। তবে প্রথমার্ধের যোগ করা সময়ে বড় এক ফাঁড়া কাটে মিশরের। গোলকিপার শুবিরের ভুলের মাথায় হেড করেছিল ইরান, কিন্তু বলটি পোস্টের সামান্য বাইরে দিয়ে চলে যায়।
দ্বিতীয়ার্ধে অবশ্য দুই দলের খেলাই কিছুটা কৌশলগত রূপ নেয়। ইতোমধ্যে নকআউট নিশ্চিত করা মিশর গতি কিছুটা কমিয়ে দেয় এবং ৫৮তম মিনিটে সালাহকে মাঠ থেকে তুলে নেওয়া হয়।
শেষ মুহূর্তের মহানাটক ও মিলিমিটারের ট্র্যাজেডি:
আসল রোমাঞ্চ তখনো তোলা ছিল ম্যাচের অন্তিম লগ্নের জন্য। ম্যাচের নির্ধারিত ৯০ মিনিট শেষ, যোগ করা সময়ের খেলা চলছে। ঘড়ির কাঁটা তখন ষষ্ঠ মিনিট ছাড়িয়ে দশম মিনিটে। ঠিক এই সময়ে মিশরের বক্সে বল পাঠায় ইরান, আর তা জালে জড়াতেই বাঁধনহারা উল্লাসে মেতে ওঠে পুরো ইরানি শিবির! মাঠের খেলোয়াড় থেকে শুরু করে ডাগআউটের সবাই তখন ইতিহাস গড়ার আনন্দে মাতোয়ারা— এই জয়ে যে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের নকআউটে পা রাখছে ইরান!
কিন্তু ফুটবল দেবতা যেন আজ অন্য এক নির্মম স্ক্রিপ্ট লিখে রেখেছিলেন। রেফারি হাত তুললেন, মাঠের খেলায় প্রবেশ করল ভিএআর (VAR)। রেফারি যখন মনিটরের সামনে দাঁড়িয়ে, তখন পুরো স্টেডিয়ামে পিনপতন নীরবতা। স্বয়ংক্রিয় রিপ্লেতে (Automated Replay) দেখা গেল এক নির্মম সত্য— গোল করার মুহূর্তে ইরানের শোজা খালিলজাদেহর হাত ও পায়ের এক পাশের সামান্যতম অংশ অফসাইড লাইনের বাইরে ছিল। মাত্র কয়েক মিলিমিটারের ব্যবধানে বাতিল হয়ে গেল ইরানের সেই ‘ঐতিহাসিক’ গোল!
হৃদয়ভঙ্গের যন্ত্রণার এখানেই শেষ নয়। ঠিক তার পরের মুহূর্তেই সাঈদ ইজাতোলাইয়ের একটি অবিশ্বাস্য হেড মিশরের ক্রসবারে লেগে ফিরে আসে। ভাগ্যদেবী আজ এতটাই নিষ্ঠুর ছিলেন যে, মিলিমিটারের ব্যবধানে গোললাইন পার হতে দেয়নি বলটিকে।
সমীকরণ ও অন্তহীন অপেক্ষা
এই ড্রয়ের ফলে গ্রুপ ‘জি’ থেকে আগেই নকআউট নিশ্চিত করা মিশর এবং ৫-১ ব্যবধানে নিউ জিল্যান্ডকে উড়িয়ে দেওয়া বেলজিয়াম পরের রাউন্ডে চলে গেল। আর ৩ ম্যাচে ৩টি ড্র নিয়ে ৩ পয়েন্ট পাওয়া ইরানের প্রথমবার নকআউটে যাওয়ার স্বপ্ন এখন ঝুলছে ভাগ্যের ওপর— সেরা চার তৃতীয় স্থানধারী দলের একটি হতে পারলে তবেই মিলবে শেষ ষোলোর টিকিট।
যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশের মানুষের জন্য এই জয় হতে পারত অপার আনন্দের এক শ্রেষ্ঠ উপহার। কিন্তু সিয়াটলের মাঠে ইরান যা পেল, তা কেবলই কয়েক মিলিমিটারের ব্যবধানে স্বপ্নভঙ্গের এক অন্তহীন ও যন্ত্রণাময় অপেক্ষা!
আপনার মতামত লিখুন :