ঠিকাদার উধাও, প্রকৌশলী বদলি, কোটি টাকার দুই শিক্ষা ভবনের কাজ থমকে নাটোরে


কুষ্টিয়া প্রতিনিধি প্রকাশের সময় : নভেম্বর ১৫, ২০২৫, ৯:২৪ অপরাহ্ন

নাটোরে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের দুটি নির্মাণকাজে ভয়াবহ অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। জেলার সদর উপজেলার বিলগারিয়া দাখিল মাদ্রাসা এবং লালপুর উপজেলার বারঘরিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের ভবন নির্মাণে কোটি টাকার প্রকল্প হলেও বছর গড়িয়েছে, শেষ হয়নি কাজের অর্ধেকও।

অভিযোগ, সংশ্লিষ্ট নির্বাহী প্রকৌশলী (বদলি হয়ে এখন ঢাকায়) এবং ঠিকাদাররা মিলে সরকারি টাকার কোটি টাকারও বেশি বিল তুলে ভাগবাটোয়ারা করেছেন। ফলে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা বছরের পর বছর শ্রেণিকক্ষ সংকটে ভুগছে। তবে বর্তমান নির্বাহী প্রকৌশলী শিক্ষার্থীদের কথা বিবেচনায় নিয়ে দ্রুত দুইটি প্রতিষ্ঠানের কাজ শেষ করার উদ্যোগ নিয়েছেন; এতে কিছুটা আশার সঞ্চার হয়েছে অভিভাবক, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে।

জানা গেছে, বিলগারিয়া দাখিল মাদ্রাসায় ৯ মাসের কাজ ৫ বছরেও শেষ হয়নি। ২০২১ সালের ২২ জুন ৭৬ লাখ ৫০ হাজার টাকার এই নির্মাণকাজের কার্যাদেশ দেওয়া হয় মেসার্স আব্দুল মান্নানকে। কাজটি শেষ হওয়ার কথা ছিল ৯ মাসের মধ্যে। কিন্তু ৫ বছর পেরিয়ে গেলেও কাজের প্রায় ৩০ শতাংশ এখনো বাকি।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, পুরো ভবনের মোজাইকের কাজ, জানালা-দরজা, টাইলস, স্যানিটারি ও ইলেকট্রিক্যাল ফিটিংস, এমনকি রঙের কাজও অসমাপ্ত। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটির একজন শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘ভবনটা এখনো পুরোপুরি ব্যবহার করা যাচ্ছে না। বাচ্চারা গাদাগাদি করে পুরনো ভবনে ক্লাস করছে। বর্ষাকালে ভেতরে পানি ঢোকে। অথচ প্রকল্পের টাকা তোলা হয়ে গেছে বলে জানতে পেরেছি।’

অভিযোগ রয়েছে, তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী ইঞ্জিনিয়ার আসাদুজ্জামান (বর্তমানে প্রধান কার্যালয়ের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী) ঠিকাদারের সঙ্গে যোগসাজশ করে প্রায় ৭০ লাখ টাকা বিল তুলে নেন। প্রকল্পের মাত্র ৬ লাখ টাকার বিল বাকি থাকলেও বাস্তবে প্রায় ৩০ লাখ টাকার কাজ এখনো অসমাপ্ত।

ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের পর ৫ আগস্ট ঠিকাদার এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যায়। এরপর নির্বাহী প্রকৌশলী আসাদুজ্জামান গোপনে বদলি নিয়ে ঢাকায় যোগ দেন।

একই রকম বারঘরিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের ভবনের কাজও মুখ থুবড়ে পড়েছে। ২০২২ সালের ১৫ মার্চ ৮০ লাখ ৭৫ হাজার টাকার এই প্রকল্পের কাজের কার্যাদেশ দেওয়া হয় শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের লালপুর শাখা থেকে। ৯ মাসের মধ্যে ভবনটি শেষ হওয়ার কথা থাকলেও প্রায় চার বছর পরও ৪৫ শতাংশ কাজ বাকি।

এ প্রকল্পে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান মেসার্স সিফাত এন্টারপ্রাইজ ও নির্বাহী প্রকৌশলী আসাদুজ্জামানের বিরুদ্ধে ৭২ লাখ টাকার বিল তুলে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এখনো ছাদের কাজ, প্লাস্টার, টাইলস, দরজা-জানালা, স্যানিটারি ও ইলেকট্রিক্যাল কাজসহ অনেক অংশ পড়ে আছে।

বিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থী বলেন, ‘নতুন ভবনের কাজ বন্ধ পড়ে আছে অনেক দিন। পুরনো ভবনে আমরা একসঙ্গে তিনটি ক্লাস করি। গরমে বসা যায় না, বৃষ্টি এলে পড়া বন্ধ হয়ে যায়।’

সিয়াম সরকার নামে একজন অভিভাবক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘সরকারের টাকা খেয়ে প্রকৌশলী আর ঠিকাদার চলে গেছে, ভুগছে আমাদের ছেলেমেয়েরা। এভাবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কাজ হলে গ্রামের উন্নয়ন কবে হবে?’

স্থানীয়রা বলছেন, বছর পেরিয়ে গেলেও শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর এখনো দায়ীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। সংশ্লিষ্টদের দাবি, অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত তদন্ত ও ব্যবস্থা নেওয়া হোক এবং অসমাপ্ত কাজ দ্রুত শেষ করে শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি দূর করা হোক।

তবে যে প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে তাকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি মুঠোফোনে সাড়া দেননি।

বারঘরিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের সভাপতি সবুর মাহমুদ সোহেল ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘ভবনের ছাদের ফাটল দিয়ে পানি পড়ে ভেতরে, মনে হয় যেন বিল্ডিংটার কোনো স্থায়িত্বই থাকবে না। চারতলা ভবনটা হয়েছে কিন্তু ভেতরের কোনো কাজই শেষ হয়নি। ২০২১ বা ২০২২ সালের দিকে কাজটা শুরু হয়েছিল, এখনো বন্ধ পড়ে আছে। ঠিকাদার টাকা তুলে নিয়ে নিয়ে চলে গেছে, তারপর আর কোনো খবর নেই। আমি নিজে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেছি—কেউ সাড়া দেয়নি। ফলে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় মারাত্মক সমস্যা হচ্ছে। গরমের সময় এক রুমে গাদাগাদি করে ক্লাস নিতে হয়, অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়ে। আমরা বহুবার অনুরোধ করেছি, কিন্তু কেউ দেখছে না।’

বর্তমান নির্বাহী প্রকৌশলী মাতোয়ারা পারভীন বলেন, ‘ভবনের কাজ খুব বেশি বাকি নেই। আমরা সরেজমিনে গিয়ে দেখেছি, কিছুদিন কাজ বন্ধ ছিল—ঠিকাদারও পালিয়ে ছিল। আমি নিজে বিষয়টা দেখছি; ঠিকাদারকে খুঁজে বের করা হয়েছে। আবার কাজ শুরু হচ্ছে। এই মাসের মধ্যেই যতটুকু কাজ বাকি আছে, তা শেষ হয়ে যাবে।’