ধ্যান, মৌনতা ও মেডিটেশন
ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ
সভ্যতার ক্রমবিকাশের সকল পর্যায়ে ধ্যান, মৌনতা ওরফে মেডিটেশন মানবজাতিকে জীবন সাধনা ও স্রষ্টার আরাধনায় সদা সম্পৃক্ত রেখেছে। কর্মক্লান্ত মানুষ, পরিশ্রান্ত, দুশ্চিন্তায় দুস্কর্মে জর্জরিত মানুষ, সমস্যাসঙ্কুল মানুষ ধ্যানে বসে নতুন করে নিজের মধ্যে আত্মবিশ্বাসের সাহস সঞ্চয় করে, নিজেকে হালকা করে নতুন উদ্যমে চলার সাহস সঞ্চয় করে, নিজেকে ঝালাই করে নেয়। মেডিটেশনে আত্মিক শান্তি, মনকে শান্ত ও স্থির রাখে, যা মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে।
সৃষ্টিকর্তার সাথে সংযোগ বৃদ্ধি : স্রষ্টার সাথে সম্পর্ক গভীর করে এবং তাঁর প্রতি ভালোবাসা বাড়ায়। নিজের চিন্তা ও কর্ম সম্পর্কে অধিক সচেতন করে তোলে। সে অর্থে ধ্যান ও আধ্যাত্মিকতার মাধ্যমে চলে অভ্যন্তরীণ শান্তি অন্বেষণ।
সকল ধর্মেই জীবন সাধনার পরতে পরতে ধ্যান বা মেডিটেশন বা মোরাকাবার তাগিদ বা অভ্যাসকে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। ইসলামে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ বা সালাত আদায় একটি প্রাত্যহিক ও অনিবার্য মেডিটেশন বা মোরাকাবা। নামাজকে মাকসুদুল মুমেনিন এবং একই সাথে মিরাজুল মোমেনিনও বলা হয়। এ সময় সুশৃঙ্খল, সুবিনীত, নিরাকার খোদার সাথে সাক্ষাত ও ভাববন্ধনের সুযোগ মেলে। নির্দিষ্ট সময়ান্তে দিনে পাঁচবার যদি সৃষ্টিকর্তার সাথে বিনম্র শ্রদ্ধায় ও স্মরণে আত্মসমর্পনের সমূহ সুযোগ লাভ ঘটে তবে তা নিঃসন্দেহে পরম সৌভাগ্যের ব্যাপার, স্বয়ং সৃষ্টিকর্তাই এ সুযোগ এনায়েত করেছেন তার প্রিয়তম বান্দাদের জন্য। কুরআনেই আল্লাহ বলেছেন, ‘তারা আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টির বিষয়ে চিন্তা করে’। তাফাক্কুর, তাদাব্বুর, মুরাকাবাহ এগুলোই আসল হালাল মেডিটেশন, যা ঈমান বাড়ায়, আত্মাকে প্রশান্ত করে।
হিন্দুধর্ম ও বৌদ্ধধর্মে ধ্যানের মূল পার্থক্য হলো তাদের লক্ষ্য ও পদ্ধতিতে; বৌদ্ধ ধ্যানের লক্ষ্য নির্বাণ (দুঃখমুক্তি), যা মননশীলতা (mindfulness) ও শ্বাস-প্রশ্বাসের ওপর মনোযোগের মাধ্যমে অর্জিত হয়, অন্যদিকে হিন্দু ধ্যানের লক্ষ্য পরমাত্মার (ব্রহ্ম) সাথে সংযোগ স্থাপন, যা আত্ম-অনুভূতি (self-realization) ও সমাধিতে পৌঁছানোর জন্য আত্মার উপর মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করে, যেমন- যোগ দর্শনে বর্ণিত হয়েছে। উভয় ধর্মেই ধ্যান একটি অপরিহার্য অনুশীলন হলেও, বৌদ্ধধর্মের মনোযোগ দেহের প্রতি, আর হিন্দুধর্মের মনোযোগ আত্মার প্রতি নিবদ্ধ থাকে, যদিও উভয়েই বিভিন্ন পদ্ধতি (যেমন তান্ত্রিক কৌশল) ব্যবহার করে। বৌদ্ধ ধ্যান এর লক্ষ্য নির্বাণ লাভ, দুঃখের চক্র থেকে মুক্তি এবং মনের আসক্তি দূর করা। পদ্ধতি : মননশীলতা (mindfulness), আনাপানস্মৃতি (শ্বাস-প্রশ্বাসের ওপর মনোযোগ), স্মৃতি ও অনুস্মৃতি (recollection) এবং অশুভ ভাবনা দূর করার ওপর জোর দেওয়া হয়।
হিন্দুধর্মে ধ্যান এর লক্ষ্য হচ্ছে, পরমাত্মা বা ঈশ্বরের সাথে সংযোগ স্থাপন, আত্ম-অনুভূতি এবং সমাধি অবস্থা অর্জন। পদ্ধতি: আত্মার উপর মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করা, ঈশ্বরের রূপ বা মন্ত্র জপ এবং যোগসূত্রে বর্ণিত একাগ্রতার পদ্ধতি অনুসরণ করা। উভয় ঐতিহ্যেই ধ্যান অনুশীলনের মাধ্যমে উচ্চতর চেতনা বা জ্ঞানলাভের চেষ্টা করা হয়। তন্ত্রের মতো কিছু শাখায় উভয় ধর্মেই দৃশ্যায়ন (visualization) ও মন্ত্রের ব্যবহার দেখা যায়।
খ্রিস্টধর্মে ধ্যান (Christian Meditation) হলো বাইবেলের শিক্ষা, ঈশ্বরের বাক্য বা নির্দিষ্ট চিন্তার উপর গভীর মনোযোগ দেওয়া ও প্রতিফলন করা, যাতে ঈশ্বরের উপস্থিতি অনুভব করা যায় এবং তাঁর সাথে সম্পর্ক গভীর হয়; এটি শুধু শান্ত থাকা নয় বরং ঈশ্বরের ভালবাসা ও তাঁর বাক্য নিয়ে মনন করা, যা লেকটিও ডিভিনা (Lectio Divina) পদ্ধতির মাধ্যমে হতে পারে, যেখানে বাইবেল পাঠ, চিন্তা, প্রার্থনা ও ধ্যানের মাধ্যমে ঈশ্বরের সাথে কথোপকথন করা হয়, যা মন, শরীর ও আত্মাকে ঈশ্বরের দিকে পরিচালিত করে।
খ্রিস্টান ধ্যানের মূল বিষয়: শাস্ত্রের উপর ধ্যান (Scriptural Meditation): গীতসংহিতা অনুযায়ী, ঈশ্বরের বাক্য নিয়ে ধ্যান করলে বিশ্বাসীরা সমৃদ্ধি লাভ করে, যেমন একটি সতেজ গাছ জল দ্বারা পুষ্ট হয়। ঈশ্বরের সাথে সম্পর্ক (Relationship with God): এর মূল লক্ষ্য ঈশ্বরের প্রেম ও ইচ্ছার উপর ভিত্তি করে তাঁর সাথে একটি গভীর ব্যক্তিগত সম্পর্ক স্থাপন করা, যা যোগাযোগ ও বোঝাপড়াকে উন্নত করে। লেকটিও ডিভিনা (Lectio Divina): এটি ধ্যানের একটি প্রাচীন পদ্ধতি, যেখানে ধীরে ধীরে বাইবেল পাঠ করে তার অর্থ নিয়ে চিন্তা করা হয় এবং ঈশ্বরের কণ্ঠস্বর শোনার চেষ্টা করা হয়, যা হৃদয়কে স্পর্শ করে। শান্ত ও স্থিরতা (Silence & Stillness): এটি কেবল ‘শব্দহীন’ বা ‘চিন্তা-মুক্ত’ হওয়া নয় বরং ঈশ্বরের উপস্থিতিতে শান্তভাবে থাকা এবং তাঁর প্রতি সাড়া দেওয়া, যা মনকে শান্ত করে।
সর্ববাদী মত ও সর্বজনীনভাবে ধ্যানমগ্ন হওয়ার সাধারণ রূপরেখা এমনটি হতে পারে (১) আরাম করে বসুন: সোজা হয়ে, কিন্তু শক্ত না হয়ে আরামদায়ক ভঙ্গিতে। (২) মনোযোগ দিন: শ্বাস-প্রশ্বাসের উপর মনোযোগ দিন অথবা একটি নির্দিষ্ট বিষয় নিয়ে ভাবুন। (৩) চিন্তা বা মনন: সেই শব্দের অর্থ নিয়ে গভীরভাবে ভাবুন, সৃষ্টিকর্তা আপনাকে কী বলতে চাইছেন? (৪) প্রার্থনা ও প্রতিক্রিয়া: ঈশ্বরের প্রেম ও বার্তার প্রতি আপনার হৃদয় কীভাবে সাড়া দিচ্ছে, তা প্রকাশ করুন; এটি কথা বা নীরবতার মাধ্যমে হতে পারে। (৫) ধৈর্য্য ও ধারাবাহিকতা: নিজেকে সমালোচনা না করে আলতোভাবে মনোযোগ ফিরিয়ে আনুন; এটি একটি অনুশীলন, যা সময় ও ধৈর্যের সাথে উন্নত হয়। আর সে কারণেই মেডিটেশনকে মানব স্বাস্থ্যরক্ষা বিদ্যা ও বিজ্ঞানে একটি গুরুত্বপুর্ণ পর্ব বিবেচনায় সকল দেশ ও অর্থনীতিতে এই শাস্ত্রের স্বীকৃতি রয়েছে। এর আয়-ব্যয় ব্যবস্থাপনায় রাষ্ট্রীয় শুল্ক ও কর ব্যবস্থায় বিশেষ ছাড় বা রেয়াত দেয়ার বিধানও রাখা হয়েছে।
(লেখক: সাবেক সচিব, বাংলাদেশ সরকার ও সাবেক চেয়ারম্যান, এনবিআর। বর্তমান চেয়ারম্যান, সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন)
আপনার মতামত লিখুন :